
ঢাকার মিরপুর এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকেরা। একদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও রান্না শেষ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন চালকেরা।
মিরপুরের আমতলা এলাকার একটি টিনের ছাউনি ঘরে আটটি পরিবারের জন্য রয়েছে একটি মাত্র রান্নাঘর। সেখানে মাত্র দুটি চুলা দিয়ে পালা করে চলে রান্না। কিন্তু গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, এক পরিবারের রান্না শেষ হতেই পার হয়ে যাচ্ছে কয়েক ঘণ্টা। গৃহিণী শিরিন বেগম বেলা ১১টায় রান্না শুরু করে দুপুর সাড়ে ১২টাতেও একটি পদ শেষ করতে পারেননি। তিনি জানান, সরাসরি চাল-পানি দিয়ে ভাত বসানো যাচ্ছে না; প্রথমে পানি গরম করে নিয়ে তারপর কোনোমতে চাল দিয়ে ভাত রাঁধতে হচ্ছে। গ্যাসের সংকটে ক্ষুব্ধ শিরিন বলেন, 'একবার রানতেই দিন পার।'
একই রান্নাঘরে শিরিনের আগে রান্না শেষ করা রেশমা বেগম জানান, সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কষ্ট করে তিন পদের রান্না ও রাতের খাবার একসঙ্গে সেরেছেন তিনি। রেশমা ও শিরিন গৃহিণী হলেও তাঁদের ঘরের অন্য তিন পরিবারের নারীরা পোশাক কারখানায়, একজন বাসাবাড়িতে এবং অন্যজন স্বামীর সঙ্গে দোকানে কাজ করেন। কর্মজীবী এসব নারীদের ভোগান্তি আরও বেশি। ভোর চারটা থেকে উঠে তাঁদের রান্নার কাজ শুরু করতে হয়, কিন্তু অনেক সময় চুলাই জ্বলে না।
শুধু আমতলা নয়, সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফাহিমা আক্তারের ঘরের চিত্রও একই। আগে যেখানে দুপুর ১২টায় রান্না বসালে দেড়টার মধ্যে শেষ হতো, এখন ৩০ শতাংশ গ্যাসও পাওয়া যায় না। দুই চুলা একসঙ্গে জ্বালানো যায় না। বাধ্য হয়ে সকাল ১০টা থেকেই দুপুর ও রাতের রান্না শুরু করতে হয়। এমনকি গ্যাসের অভাবে সকালে তাঁর স্বামী ও সন্তানকে পান্তা ভাত খেতে হচ্ছে বলে জানান ফাহিমা।
এই গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে মিরপুরের সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। মিরপুর সিরামিকস রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভারশন সেন্টারের ডিসপেনসার অপারেটর মোহাম্মদ আকাশ জানান, গ্যাসের চাপ গত কয়েক দিনের চেয়েও কমে সর্বোচ্চ ৭০-এ নেমেছে, যা আগে ৮০ থেকে ৯০ ছিল। এই চাপে ৬০ কেজির সিলিন্ডারে ১৮০ থেকে ২০০ টাকার গ্যাস ভরতেই ৩ থেকে ৪ মিনিট লাগছে। চাপ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় একসঙ্গে দুটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না।
স্টেশনে দীর্ঘ ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১৭৮ টাকার গ্যাস পেয়েছেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক খোরশেদ আলম। তিনি জানান, চাপ কম থাকায় গ্যাসের সঙ্গে হাওয়া ঢুকে যায়, ফলে এই গ্যাস দিয়ে ৩০ কিলোমিটারও গাড়ি চালানো যাবে না। অথচ আগে এসি বন্ধ রাখলে ৩৮-৪০ কিলোমিটারও চলত। মিরপুর সুপার লিংকের বাসচালক মামুন মিয়া জানান, তাঁর বাসে সাধারণত ২,৭০০ থেকে ২,৮০০ টাকার গ্যাস লাগলেও আজ পেয়েছেন মাত্র ২৬০ টাকার গ্যাস। ক্ষুব্ধ মামুন বলেন, 'সরকার গ্যাস বন্ধ করলে একেবারে বন্ধ করে দিক। এই যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। অল্প অল্প গ্যাস নিয়া কিছুই হয় না। না চালানো যায় গাড়ি, না হয় রোজগার, না থাকে মালিকের পয়সা।'
গ্যাসের চাপ না থাকায় মিরপুরের মিনারভা ও শাহজালাল সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। শাহজালাল স্টেশনের কর্মী রফিকুল ইসলাম জানান, রাত একটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গ্যাস ছিল, এরপর থেকে লাইনে আর কোনো গ্যাস নেই। অন্যদিকে, আরিয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ৩৯টি প্রাইভেট কার ও ৪৩টি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি সড়কের উল্টো দিক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
তখন একটি গাড়িতে ৮০ থেকে ১০০ টাকার বেশি গ্যাস ঢোকে না।.গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও সামান্য গ্যাস নিয়ে ফিরতে হচ্ছে চালকদের।
কয়েক দিন আগেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার গ্যাস ঢুকত।
আপনার মতামত লিখুন :