Facebook Twitter Instagram YouTube

তালগাছ কমে যাওয়া কি জলবায়ুর জন্য অশনিসংকেত?


প্রকাশের সময় : জুলাই ১২, ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ /
তালগাছ কমে যাওয়া কি জলবায়ুর জন্য অশনিসংকেত?

ভাদ্র মাসের দুপুরে পাকা তালের ধুপ করে মাটিতে পড়ার শব্দ একসময় গ্রামবাংলার চেনা সংগীত ছিল। আজ সেই দৃশ্য ও শব্দ অনেকটাই বিরল। বাংলার প্রকৃতি নিঃশব্দে বদলে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার আকাশরেখার পরিচিত তালগাছ। পুরোনো গাছগুলো ঝরে পড়লেও নতুন করে তালগাছ রোপণের হার অনেক কম, যা গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পরিবেশগত সম্পদের জন্য বড় ক্ষতি।

আধুনিক কৃষি অর্থনীতিতে দ্রুত ফলন ও তাৎক্ষণিক মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়ায় ধীরগতির তালগাছ আজ অবহেলিত। অথচ একবার বড় হয়ে উঠলে এই গাছ শতাব্দীকাল বেঁচে থাকতে পারে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফল দেয়। সরকারি বা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতেও দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতির আধিপত্য থাকায় দেশীয় এই বৃক্ষটি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অথচ বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer সমৃদ্ধ এই পাম-জাতীয় বৃক্ষটি খাদ্য, বাসস্থান, কুটিরশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তালের শাঁস, পিঠা, গুড় থেকে শুরু করে পাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা বা চাটাই—সবই ছিল গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে তালগাছের গুরুত্ব অপরিসীম। খরা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার ওঠানামা মোকাবিলায় সহনশীল দেশীয় বৃক্ষ হিসেবে তাল অনন্য। এটি বেলে ও দোআঁশ মাটিতে সহজেই মানিয়ে নেয় এবং প্রবল বাতাসেও সহজে ভেঙে পড়ে না। এছাড়া দীর্ঘ জীবনচক্রের কারণে এটি দীর্ঘ সময় কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। বর্ষাকাল তালগাছ রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, কারণ এ সময় প্রকৃতি নিজেই চারার আর্দ্রতা নিশ্চিত করে।

তালগাছ রোপণের ক্ষেত্রে ভালো বীজ নির্বাচন জরুরি। ভাদ্র বা আশ্বিন মাসে ঝরে পড়া রোগমুক্ত ও পরিণত ফল সংগ্রহ করে ছায়ায় শুকিয়ে আড়াআড়িভাবে পুঁততে হয়। চারা রোপণের জন্য রাস্তার ধার, খালপাড়, বিদ্যালয়ের মাঠ বা বাড়ির সীমানা আদর্শ স্থান। রোপণের আগে প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতার গর্ত তৈরি করে তাতে পচা গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে কয়েক দিন রেখে দিলে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ে। পূর্ণবয়স্ক গাছের জন্য ১০ থেকে ১২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রথম কয়েক বছর গবাদিপশু থেকে সুরক্ষা ও আগাছা পরিষ্কার করলেই গাছটি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

পরিবেশ রক্ষায় তালগাছের ভূমিকা বহুমুখী। এটি বাবুই, শালিক, দোয়েলসহ নানা প্রজাতির পাখির নিরাপদ আশ্রয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও এর অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া নদীভাঙন রোধে তালগাছের শিকড় মাটিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। তবে নদীবিশেষজ্ঞদের মতে, বড় নদীর তীব্র ভাঙন রোধে তালগাছকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে না দেখে প্রকৌশলগত প্রতিরক্ষা ও নদী ব্যবস্থাপনার একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সব মিলিয়ে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে তালগাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।