
মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা সংসারের জরুরি প্রয়োজনে নিয়মিত আয়ের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অনেকের বড় ভরসা। তবে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বিনিয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত মুনাফার বদলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে এর মেয়াদ, প্রয়োজনীয়তা, মুনাফার হার এবং কর সংক্রান্ত নিয়মগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। নিচে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো যা এড়িয়ে চললে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রথমত, জরুরি প্রয়োজনে রাখা টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়পত্র কেনা হয়। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে মেয়াদপূর্তির আগে এটি ভাঙাতে হলে প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যেতে পারে। তাই আপৎকালীন খরচ, চিকিৎসা বা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে—এমন অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে হাতে পর্যাপ্ত জরুরি তহবিল রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের সীমা ও স্তর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুনাফার হারেও পার্থক্য হতে পারে। তাই বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের আগে কোন সীমায় কী হারে মুনাফা পাওয়া যাবে তা জেনে নিতে হবে। এছাড়া পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে বৈধভাবে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে এবং অর্থের মালিকানা ও করের বিষয়টি সঠিকভাবে মেনে চললে বিনিয়োগ পরিকল্পনা আরও কার্যকর হয়। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর ও সরকারি নিয়ম যাচাই করে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, টিআইএন (TIN) ও করের নিয়ম উপেক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য। টিআইএন বা কর-সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে না দিলে প্রযোজ্য হারের চেয়ে বেশি উৎসে কর কেটে নেওয়া হতে পারে। তাই কেনার আগেই নিজের টিআইএন, আয়কর রিটার্ন এবং উৎসে করের নিয়মগুলো জেনে নিন, যাতে মুনাফার ওপর কোনো অপ্রত্যাশিত কর্তন এড়ানো যায়।
চতুর্থত, নিজের প্রয়োজন না বুঝে ভুল স্কিম বেছে নেওয়া যাবে না। সব সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পাওয়ার পদ্ধতি এক নয়। কারও নিয়মিত মাসিক আয় প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও মেয়াদ শেষে একসঙ্গে টাকা পাওয়া সুবিধাজনক। যেমন, পরিবার সঞ্চয়পত্রে মাসিক মুনাফা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, আবার কিছু সঞ্চয়পত্রে তিন মাস অন্তর মুনাফা পাওয়া যায়। তাই কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনার মুনাফা প্রতি মাসে প্রয়োজন, তিন মাস পরপর, নাকি মেয়াদ শেষে?
পঞ্চমত, সব সঞ্চয় এক জায়গায় বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে 'সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা' ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতের সব সঞ্চয় শুধু সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদ ও খাতে ভাগ করে রাখা ভালো। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করলে জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সহজ হয়। সবশেষে, শুধু মুনাফার হার নয়, বরং কতদিন টাকা রাখতে পারবেন, কখন মুনাফা প্রয়োজন এবং কর কতটা দিতে হবে—এসব বিষয় হিসাব করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আপনার মতামত লিখুন :