Facebook Twitter Instagram YouTube

কর-পূর্ব মুনাফার ১ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় বাধ্যতামূলক করছে সরকার


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৩০, ২০২৬, ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ /
কর-পূর্ব মুনাফার ১ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় বাধ্যতামূলক করছে সরকার

দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমকে একটি সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে, যার খসড়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কর-পূর্ব মুনাফার ১ শতাংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে এর চেয়ে বেশিও ব্যয় করতে পারবে।

প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, সরকারি মালিকানাধীন বা সরকারনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ছাড়া ২০২২ সালের জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সীমার বেশি ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই নীতিমালার আওতায় আনা হবে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য চূড়ান্ত নীতিমালায় বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হবে।

এই উদ্যোগের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে এবং তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। তিনি আশ্বস্ত করেন, বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, এটি প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর হবে এবং পরবর্তীতে তা পর্যালোচনা করা হবে। সিএসআর কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি ও প্রধান সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।

সিএসআরের অর্থ ব্যয়ের জন্য বেশ কিছু অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা, দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবিকা উন্নয়ন, নারী ও শিশু উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং প্রবীণদের সহায়তা। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ক্রীড়া উন্নয়ন এবং সড়ক ও জননিরাপত্তা খাতও এই তালিকায় রয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার নির্ধারিত খাতেও এই অর্থ ব্যয় করা যাবে।

তবে সিএসআরের টাকা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ব্যবসায়িক খরচ, নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ, বিজ্ঞাপন বা প্রচারের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে অনুদান হিসেবেও এই অর্থ দেওয়া নিষিদ্ধ থাকবে। সিএসআর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের মতো উপযুক্ত সংস্থাকে অংশীদার করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবছর সিএসআর খাতের সার্বিক দিক নিয়ে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব না হলে তার কারণ, অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ এবং তা ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী অর্থবছরে ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। এই কার্যক্রমে শুধু খরচের অঙ্ক দিয়ে সাফল্য বিচার করা হবে না, বরং প্রকল্পের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওয়েবসাইটে এই প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার প্রকাশ করতে হবে।

বর্তমানে দেশে কেবল নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য সিএসআর ব্যয় বাধ্যতামূলক রয়েছে। যেমন মোবাইল অপারেটরদের মোট আয়ের ১ শতাংশ বিটিআরসির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে জমা দিতে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সাল থেকে ব্যাংকগুলোকে সিএসআরে উৎসাহিত করে আসছে এবং ২০২২ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নীতিমালাও করেছে, যদিও সেখানে সুনির্দিষ্ট কোনো হার বেঁধে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ২০১০ সাল থেকে সিএসআর খাতে ব্যয়ের ওপর কর ছাড় দিয়ে আসছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সরকারের নতুন এই উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক এবং বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এর ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি কোনো জটিলতা তৈরি না হয়। তবে সিএসআরের এই ব্যয় কোনোভাবেই কর-পূর্ব মুনাফার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo