
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো আমরা মনে করি, অতীত শেষ হয়ে গেছে। আমরা তার জন্য আলাদা একটি ঘর বানিয়ে তাতে তালা ঝুলাই, কিন্তু কোনো পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকলেই বোঝা যায় অতীত এত ভদ্র নয় যে তাকে একটি ঘরে আটকে রাখা যাবে। সে তাকের ওপর বসে থাকে, ধুলোর মধ্যে শুয়ে থাকে, পুরোনো কাগজের গন্ধে লুকিয়ে থাকে, কোনো অচেনা হাতের লেখা হয়ে হঠাৎ চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। আল-জাহিজের খাজানা সেই ধরনের একটি জায়গা। এর ইতিহাসকে কেবল একটি প্রাচীন আরবি বইয়ের দোকানের ইতিহাস বললে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই হারিয়ে যাবে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের গল্প একই সঙ্গে বইয়ের ইতিহাস, আরবি সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস, জেরুজালেমের ইতিহাস, ফিলিস্তিনের স্মৃতি এবং নির্বাসনের ইতিহাস।
পারিবারিক সূত্রে এর সূচনা উনিশ শতকের শেষভাগে, প্রায় ১৮৯৩ সালে কারাকে। সালমান আল-মায়েতাহ ছিলেন লিপিকার, সংগ্রাহক ও বই ব্যবসায়ী। আল-জাহিজের খাজানার জন্ম হয়েছিল সেই মধ্যবর্তী অঞ্চলে, যেখানে লেখা এবং পণ্য, জ্ঞান এবং স্মৃতি, পাণ্ডুলিপি এবং অর্থ—এগুলো তখনো একে অপরের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। কারাক থেকে জেরুজালেম, জেরুজালেম থেকে নাবলুস, হেবরন—বইয়ের এই চলাচল ছিল আরব জ্ঞান-সংস্কৃতির নিজস্ব এক ভূগোল। ১৯২১ সালে খলিল আল-মায়েতাহ জেরুজালেমে পারিবারিক বইয়ের ব্যবসাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই সময়ের জেরুজালেম ছিল ধর্মীয় তীর্থ, সাম্রাজ্যিক রাজনীতি, আরবি সাহিত্য, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রণযন্ত্র, বাজার, মসজিদ, গির্জা, ইহুদি পাড়া, বিদেশি পর্যটক, পণ্ডিত এবং রাজনৈতিক উদ্বেগে পরিপূর্ণ।
খাজানা বা ভাণ্ডার হিসেবে এর পরিচয়টি মৌলিক। দোকান যেখানে দাম জিজ্ঞেস করে, খাজানা সেখানে জিজ্ঞেস করে—এটি হারিয়ে গেলে কী হারাবে? এই পার্থক্যটি সভ্যতার ইতিহাসে বিশাল। যে সমাজ বইকে কেবল পণ্য মনে করে, সে বইয়ের বাজার তৈরি করতে পারে। কিন্তু যে সমাজ বইকে স্মৃতি মনে করে, সে সংরক্ষণের সংস্কৃতি তৈরি করে। আল-জাহিজের খাজানার ইতিহাসে এই দ্বিতীয় প্রবণতাটিই বারবার ফিরে আসে। আব্বাসীয় যুগের মহান আরবি গদ্যকার আল-জাহিজের নামানুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে, যিনি পর্যবেক্ষণের লেখক ছিলেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, পৃথিবীকে বোঝার জন্য কখনো কখনো মহৎ বিষয় নয়, ক্ষুদ্রতম জিনিসটির দিকে তাকাতে হয়। একটি বইয়ের দোকানও তেমন ক্ষুদ্র বস্তু, কিন্তু তাকালে দেখা যায় তার মধ্যে একটি সভ্যতা লুকিয়ে আছে।
১৯৪৭ সালে খলিল আল-মায়েতাহর মৃত্যুর পর সংঘাতের মধ্যে দোকানটি পুড়ে যায়, তবে বাড়িতে রাখা কিছু বই ও পাণ্ডুলিপি রক্ষা পায়। খলিলের ছেলে মামদুহ আল-মায়েতাহ জেরুজালেম থেকে আম্মানে চলে গেলেন। একজন নির্বাসিত মানুষ যখন নিজের দেশ থেকে বেরিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে থাকা বস্তুগুলো হঠাৎ নতুন অর্থ পায়। একটি বই হয়ে ওঠে ভাষার ভূখণ্ড। এই অর্থে আল-জাহিজের খাজানা ১৯৪৮-এর পরে শুধু একটি বইয়ের দোকান ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল স্মৃতি বহনের একটি মাধ্যম। আম্মানে এসে মামদুহ আল-জাহিজের খাজানাকে এমন এক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিলেন, যেখানে বই কেনার পাশাপাশি বই ধার নেওয়ার সুযোগও ছিল। স্বল্পমূল্যে পাঠকের হাতে বই পৌঁছানো এবং বইয়ের বিনিময়ে বই নেওয়ার মতো ব্যবস্থাও ছিল।
আরবি সাহিত্যকে শুধু কবিতা ও উপন্যাসের ইতিহাস হিসেবে দেখলে এই ধরনের বইয়ের দোকানের গুরুত্ব বোঝা কঠিন। বইয়ের দোকান ছিল এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সাহিত্যিক অবকাঠামো। বিশ্ববিদ্যালয় যে পাঠক তৈরি করতে পারে না, বইয়ের দোকান কখনো কখনো তা তৈরি করে। ২০১৮ সালে আগুনে প্রায় ১০ হাজার বই, প্রায় ৩ হাজার ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং বহু পুরোনো মুদ্রিত গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়। ইতিহাস কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে অলস, সে একই বিপর্যয়কে নতুন তারিখ দিয়ে আবার হাজির করে। কিন্তু বইয়ের মানুষদের জেদও ইতিহাসের মতো পুরোনো। আল-জাহিজের খাজানা আবার সংস্কার করা হলো এবং ২০২১ সালে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। এই পুনরায় খোলা কোনো সাধারণ ব্যবসা পুনরুদ্ধারের ঘটনা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক বক্তব্য—সব বই বাঁচানো সম্ভব নয়; কিন্তু বই বাঁচানোর কাজটি থামানো যাবে না।
আপনার মতামত লিখুন :