Facebook Twitter Instagram YouTube

হিমবাহ ধস ও বন্যার আগাম পূর্বাভাস কি আসলেই সম্ভব?


প্রকাশের সময় : আগস্ট ২৮, ২০২৬, ৮:০৩ অপরাহ্ণ /
হিমবাহ ধস ও বন্যার আগাম পূর্বাভাস কি আসলেই সম্ভব?

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—হিমবাহ ধস ও এ থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কি আদৌ সম্ভব? হিমালয়ের নদী উপত্যকায় হঠাৎ নেমে আসা পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত অসংখ্য ঘরবাড়ি ও মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা এর কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন। প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে লাংটাং লিরুং চূড়ার ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে হিমবাহ ও পাহাড়ের খাড়া ঢালের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়েছিল। এই ধসে নেমে আসা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ছিল মিশরের প্রায় ৭০টি গিজার গ্রেট পিরামিডের সমান।

যদিও নেপালের এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়টির আগাম পূর্বাভাস দেওয়া যায়নি, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে এমন ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার মোহন বাহাদুর চাঁদ সতর্ক করে বলেন, দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের সব হিমবাহ অঞ্চলই এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই ধস কোথায় ঘটছে, তার ওপর ভিত্তি করে আকস্মিক বন্যা থেকে শুরু করে পর্বতঘেরা গভীর জলপথে বিশাল মেগাসুনামি পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। যেমন, ২০২৩ সালে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের একটি সংকীর্ণ জলভাগে বিশাল পাথর ও বরফখণ্ড ধসে পড়ে ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের মেগাসুনামি তৈরি করেছিল। এছাড়া পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার কর্দিয়েরা ব্লাঙ্কা এলাকায় ১৯৪০-এর দশক থেকেই হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের কারণে ভয়াবহ বন্যা হয়ে আসছে।

অবশ্য উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্স। তাঁর মতে, বিপজ্জনক হিমবাহগুলোকে সঠিকভাবে নজরদারিতে রাখলে ধসের আগে সতর্ক সংকেত পাওয়া সম্ভব, যা হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। এর একটি বড় উদাহরণ সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার ব্ল্যাটেন গ্রাম। ২০২৫ সালের শুরুতে সেখান থেকে ঘন ঘন পাথর পড়তে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির যৌথ পর্যবেক্ষণে দ্রুত ধসের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। ফলে ধস নামার ৯ দিন আগেই পুরো গ্রাম ও গৃহপালিত পশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২০ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষের নিচে গ্রামটির বেশিরভাগ অংশ চাপা পড়লেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। গবেষক বেঞ্জামিন বেলভাল্ড জানান, স্পষ্ট ও উন্মুক্ত যোগাযোগের কারণে এই নিরাপদ স্থানান্তর সম্ভব হয়েছিল, যদিও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার।

হিমালয় অঞ্চলেও বর্তমানে এ ধরনের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা নেপাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ ও স্থানীয়দের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন। তবে আল্পসের তুলনায় হিমালয় অঞ্চল অনেক বিশাল হওয়ায় পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয়ের প্রায় ২১০টি হিমবাহ হ্রদ আকস্মিক বন্যার মাধ্যমে মানববসতির জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করে রেখেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ ও প্রযুক্তির অভাব। মোহন বাহাদুর চাঁদ জানান, সুইজারল্যান্ডের মতো ব্যয়বহুল ও নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা নেপালের মতো দেশের পক্ষে কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নগরায়ণ। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনে আরও বেশি হিমবাহ ধসের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি বাড়লে ভবিষ্যতে প্রাণহানির আশঙ্কাও আরও বাড়বে।

গবেষক বেঞ্জামিন বেলভাল্ড জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকেই ওই হিমবাহটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে সেখান থেকে ঘন ঘন পাথর পড়তে থাকায় বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরদারি এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে দ্রুত ধসের আশঙ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh