
নেপালের ভোটেকোশি নদীর প্রলয়ংকরী বন্যায় প্রাণ হারানো মানুষের মরদেহ স্রোতের তোড়ে বহুদূর ভেসে গেছে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হতে থাকায় সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। বন্যার উৎপত্তিস্থল রসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো এখন নুয়াকোট ছাড়াও ভাটি অঞ্চল চিতওয়ান, তনহুন, নবলপরাসীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।
নুয়াকোট, ধাদিং ও নবলপরাসী জেলার হাসপাতালের মর্গগুলোয় ইতিমধ্যে লাশ রাখার জায়গা ফুরিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে কিছু মরদেহ পাশের জেলাগুলোয় পাঠাতে হচ্ছে। পোখরা জেলার হাসপাতালগুলোও জানিয়েছে, বিভিন্ন জেলা থেকে লাগাতার লাশ আসতে থাকায় তাদের মর্গগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে চিতওয়ান জেলায়, যেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা স্থানীয় হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চিতওয়ানের ভরতপুরে একটি অস্থায়ী মর্গ গড়ে তুলছে প্রশাসন। ভরতপুর মহানগরীর বিদ্যুৎ রোডের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর একটি পরিত্যক্ত ভবনকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গত বৃহস্পতিবার চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার (সিডিও) গণেশ আরিয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চিতওয়ান অঞ্চলের ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত অংশ থেকেই ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার পূর্ব নবলপরাসী থেকে ৪১টি, ধাদিং থেকে ২৭টি ও গোরখা থেকে আরও ১১টি লাশ পোখরায় পৌঁছায়।
সিডিও গণেশ আরিয়াল জানান, চিতওয়ানের সব কটি হাসপাতালের মর্গ মিলিয়ে বড়জোর ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ একসঙ্গে রাখা সম্ভব। নতুন এই অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি লাশ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যদি এই ধারণক্ষমতাও পেরিয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। ভরতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ এই অস্থায়ী ভবনটি মেরামত ও সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছে। লাশ যাতে পচে না যায়, সে জন্য সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বসানো হচ্ছে এবং ড্রাই আইস ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার খরচ বহন করবে স্থানীয় শিল্প ও বণিক সমিতি।
এদিকে, মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পর থেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে রাসুয়া, নুয়াকোট, গোরখাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চিতওয়ানে আসতে শুরু করেছেন পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার ভরতপুরের পরিত্যক্ত ভবনটিকে যখন অস্থায়ী মর্গে রূপান্তরের কাজ চলছিল, তখনো সেখানে নিখোঁজ স্বজনদের তথ্য জানতে ভিড় জমান স্বজনেরা।
পোখরা জেলার মর্গগুলোও ভেসে আসা মরদেহে ভরে গেছে। কাস্কি জেলার সিডিও কুমান সিং গুরুং জানিয়েছেন, গত দুই দিনে তনহুন, গোরখা, পূর্ব নবলপরাসী ও ধাদিং জেলা থেকে সব মিলিয়ে ৯৩টি মরদেহ পোখরায় নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্যে পোখরা একাডেমিতে ৭২টি, নেপাল মণিপাল টিচিং হাসপাতালে ৮টি ও গণ্ডকী মেডিক্যাল কলেজসহ বাকি ছোট হাসপাতালগুলোয় দুটি করে লাশ রাখার ধারণক্ষমতা আছে। সিডিও কুমান সিং গুরুং বলেন, ‘ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।’ প্রয়োজনে বাগলুং, পর্বত ও স্যাংজা জেলায়ও মরদেহ পাঠানো হতে পারে।
লাশ বহনের জন্য বিশেষায়িত ব্যাগের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ২৩৪টি ব্যাগের মধ্যে ১১৭টি পূর্ব নবলপরাসীর মধ্যবিন্দু জেলা হাসপাতাল এবং নেপাল রেডক্রসের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাকি ১১৭টি ব্যাগ পোখরায় ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসের তথ্য কর্মকর্তা সুশীল আরিয়াল জানিয়েছেন, বর্তমানে মর্গগুলোয় ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মরদেহ রাখা হচ্ছে। তবে এই তাপমাত্রায় একটি লাশ বড়জোর ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব। সুশীল আরিয়াল বলেন, ১০ দিন বা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লাশ সংরক্ষণ করতে হলে মাইনাস বা শূন্য ডিগ্রির নিচের তাপমাত্রার আধুনিক পরিকাঠামো প্রয়োজন।
অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহগুলো সৎকারের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে প্রশাসন। ‘পরিচয়হীন ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা–২০২১’ অনুযায়ী, কাস্কি জেলার পুলিশ সুপার নবীন কার্কি জানিয়েছেন, জেলা পুলিশপ্রধানের নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। নীতিমালা অনুযায়ী, পরিচয়হীন মরদেহের ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়া, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহগুলো যাতে একটি সুরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা যায়, সে জন্য প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ট্যাগ নম্বর’ জুড়ে দেওয়া হবে এবং পরবর্তী সময় দাফনের যাবতীয় তথ্যের সঙ্গে এই ট্যাগ নম্বর নথিপত্র হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট কমিটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে শনাক্ত না হওয়া লাশগুলোর দাফন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।.নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯
আপনার মতামত লিখুন :