
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকা কুখ্যাত সন্ত্রাসী মো. মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’ অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বুধবার ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার একটি বাড়ির ওয়াশরুমের ফলস ছাদ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মোবারক ফলস ছাদ থেকে police-কে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ওড়ান। পুলিশও পাল্টা গুলি চালিয়ে তাঁকে কাবু করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৩টি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৪টি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মোবারক যে পিস্তলটি দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি সব সময় অত্যাধুনিক সাব মেশিনগান (এসএমজি) হাতের নাগালে নিয়ে ঘুমাতেন।
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বললেই চলে। নিজের নামটুকু কোনো রকমে লিখতে পারলেও পড়তে পারেন না তিনি। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। তবে ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামের এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর অপরাধজগতে তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিতি পান। পুলিশ জানায়, শিবির ক্যাডার নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধজগতে পা রাখা মোবারক পরে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সংস্পর্শে আসেন। এছাড়া কাঞ্চননগরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি আবুল কাশেমের আশ্রয়-প্রশ্রয়েও তিনি থাকতেন বলে পুলিশের দাবি।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, মোবারক মূলত বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করতেন। দুই হাতে অস্ত্র চালানো মোবারকের একটি বিশেষ ‘শখ’ ছিল, যা তিনি ইমনের কাছ থেকে শিখেছেন। গত বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে দুই হাতে গুলি করে হত্যা করার সময় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারকের এই রূপ দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মাসুদুল মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর মোবারক ও তাঁর সহযোগীরা উপর্যুপরি গুলি করেন এবং চলে যাওয়ার প্রায় ৫০ সেকেন্ড পর আবার ফিরে এসে মোবারক পুনরায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
পুলিশের তথ্যমতে, মাসুদুল হক ছাড়াও অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডে মোবারকের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর জনসংযোগে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে হত্যা, ২৯ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে ঢাকাইয়া আকবরকে হত্যা এবং ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়ায় যুবদলকর্মী ইব্রাহিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা অন্যতম। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অক্সিজেন-পশ্চিম কুয়াইশে মো. মাসুদ ও মো. আনিছ হত্যা এবং চান্দগাঁওয়ে ইট-বালু ব্যবসায়ী তাহসীন হত্যাকাণ্ডেও তাঁর জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। শুধু হত্যা নয়, চাঁদা না পেলেই ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে গুলিবর্ষণ ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ। আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমানের চন্দনপুরার বাড়িতে এক কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে পুলিশ পাহারার মধ্যেই দুই হাতে গুলি চালান মোবারক। এছাড়া হাটহাজারীর মেখলে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে এক ইটভাটা মালিকের বাড়ি এবং ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী আবসার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতেও মোবারক ও তাঁর সহযোগীদের গুলি চালানোর প্রমাণ সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক জানিয়েছেন, তাঁর কাছে থাকা এসএমজিটি বর্তমানে পলাতক সন্ত্রাসী রায়হানের কাছে রয়েছে এবং সেটি উদ্ধারে অভিযান চলছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করতেন। পাহাড়ে তাঁর যাতায়াত ও আশ্রয়ের পেছনে তাঁর প্রথম স্ত্রী ডলি চাকমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী রুনু আক্তার সহযোগিতা করতেন। ডলি চাকমার মাধ্যমে পাহাড়ের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মোবারকের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, যা তিনি অস্ত্র কেনাবেচা ও লুকিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করতেন। পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে নিহত যুবদল নেতা মাসুদুলের ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে এলে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটে ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। পুলিশ বলছে, গত দুই বছরে ৭৯৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১৪৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের আশঙ্কা, এসব অস্ত্রের একটি অংশ এখনো অপরাধীদের হাতে রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :