
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। নতুন করে তৈরি হওয়া একটি নদীর তীর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় সেখানে আবারও বড় ধরনের বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫৮৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে এখনও ২,৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে আটকে দিয়েছে। এর ফলে সেখানে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ও নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানির স্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাওয়ান ভট্টরাই জানান, বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের কারণে নদীর উপত্যকায় পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে এই ‘বেরিয়ার লেক’ বা প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি ও চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিতেশ খাডকা স্যাটেলাইট ও ড্রোন চিত্রের বরাতে জানান, সেখানে আসলে দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি চীনের অংশে হিমবাহ গলে এবং অন্যটি লেহেন্দে নদীতে ভূমিধস ও কাদামাটির স্রোতে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে হ্রদটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি রয়েছে, যা আগামী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিমাণ পানি প্রায় ১,২০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের পানির সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৃত্রিম বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে তীব্র গতিতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসবে, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলবে। এছাড়া ভাটিতে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীরাও চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে হ্রদের পানির স্তর নিরাপদ উপায়ে কমিয়ে আনা এবং আগাম সতর্কতার মাধ্যমে এই ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
এদিকে বন্যা ও ভূমিধসের কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাসুয়া জেলায় শুক্রবার হ্রদের বাঁধ উপচে পানি বের হওয়ার পর উদ্ধার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও দ্রুত তা আবার শুরু করা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভি অবশ্য জানিয়েছে, হ্রদের এই ঝুঁকি বর্তমানে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বন্যায় ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিলেও দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে এবং এই মুহূর্তে তাদের কোনো বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১২ সালে নেপালের সেতি নদীতে পাথর ও বরফধসের কারণে একই রকম ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু রেঞ্জের একটি হিমবাহ ধসে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে ৯ জন পশুপালকের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। এর দুই মাস পর সেখানে আরেকটি বড় ধস নামে। ২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের ছিংহাই প্রদেশের বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ ধসে হ্রদে ৪২ ফুট উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছিল। ২০২২ সালের মে মাসে পাকিস্তানের হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদেও শিশপার হিমবাহের কারণে সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও যথাযথ আগাম প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যেত।
আপনার মতামত লিখুন :