Facebook Twitter Instagram YouTube

ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের শঙ্কা ও জলাবদ্ধতা, ১২ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস


প্রকাশের সময় : জুলাই ৮, ২০২৬, ৬:৩৯ অপরাহ্ণ /
ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের শঙ্কা ও জলাবদ্ধতা, ১২ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস

টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড়ধসের আশঙ্কা, তীব্র জলাবদ্ধতা এবং বন্যার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেখা দিয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ দেশের একাধিক জেলায় নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিয়ানের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তাসহ দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ১২টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি পানি সমতল কেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টিতে পানি বেড়েছে, ৮৬টিতে কমেছে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩টিতে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরাতেও অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ২৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামে। এছাড়া নারায়ণহাটে ১৬৫, টেকনাফে ১৫৮, কক্সবাজারে ১২৯, রামগড়ে ১০৫, বান্দরবানে ১০২, সুনামগঞ্জের মহেশখোলায় ১০১, পাঁচপুকুরিয়ায় ৯৫, লামায় ৯৩ এবং ফেনীর পরশুরামে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াতে ১৫৩, আর কে এম সোহরায় ১৪১, চেরাপুঞ্জিতে ১৩৩ এবং দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরামে ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশের নদীগুলোর পানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের নিচু এলাকাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। একই সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। উত্তরবঙ্গে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আগামী তিন দিনে দ্রুত বাড়তে পারে, যার মধ্যে তিস্তা নদী আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা পেরিয়ে নীলফামারী ও লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি আগামী তিন দিন কমে পরে বাড়তে পারে এবং পদ্মার পানি আগামী পাঁচ দিন কমতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের একাধিক স্থান তলিয়ে যাওয়ায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। দীঘিনালা-রাঙ্গামাটির লংগদু সড়কের মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় দুপুরের পর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় সড়ক কোমরপানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সেচের নালার স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় পানি সরতে না পেরে এই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। মহালছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে আটকে পড়া যাত্রী শরিফুল ইসলাম জানান, পানি কমার অপেক্ষায় তিনি সড়কে আটকে আছেন। দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা জানান, দুপুর ১টা পর্যন্ত গত ১৮ ঘণ্টায় এলাকায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, পুরো জেলায় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার পরিবারের প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ শালবন, মোহাম্মদপুর সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা, কলাবাগান, ন্যান্সীবাজার, মোল্লাপাড়া ও কৈবল্যপিঠ এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে শালবন ও ঠাকুরছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, পানছড়ি, মানিকছড়ি ও মহালছড়ির পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও ধসের শঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে, জোয়ারের পানি ও ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। নিয়মিত গণপরিবহন না থাকায় অফিসগামী যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। চকবাজারের সরকারি কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম এবং কাতালগঞ্জের বাসিন্দা মো. হাবিব জানান, রিকশাচালকরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন এবং নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা ফজলুল হক জলাবদ্ধতার কারণে অফিসে যেতে পারেননি। প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্প অসম্পূর্ণ থাকার কারণেই এই জলাবদ্ধতার সংকট কাটছে না। সিডিএর খাল উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ ২০১৭ সালে শুরু হলেও এর ব্যয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে এবং মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের এই কাজ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও গত এপ্রিল থেকে মাঠপর্যায়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন জানান, প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হলেও বাকি কাজ আগামী অক্টোবরের আগে শুরু করা যাবে না। আইইবির সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, চট্টগ্রামের ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি হারিয়ে গেছে এবং জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি ৫ মিটার পর্যন্ত বাড়লেও আবাসিক এলাকাগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২-৩ মিটার উঁচুতে অবস্থিত, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। তবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন এলাকা পরিদর্শন করে দাবি করেছেন, নালা পরিষ্কারের আগাম উদ্যোগ ও মেগা প্রকল্পের অগ্রগতির কারণে জলাবদ্ধতা আগের চেয়ে ৮০ শতাংশ কমেছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh