
দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় কৃত্রিম শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে উসকানিমূলক তৎপরতার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী গোষ্ঠী দেশের ভেতর অস্থিরতা তৈরি করতে সীমান্তের ওপার থেকে বিপুল অর্থ সরবরাহ করছে এবং নির্বাচনের আগে টিকিট বিক্রির ব্যবসায় নামা কয়েকটি রাজনৈতিক দলও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান উল্লেখ করেন, এক পক্ষ দেশের বাইরে থেকে টাকা জোগাচ্ছে আর অন্য পক্ষ দেশের অভ্যন্তরে থেকে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। তিনি বলেন, দেশজুড়ে স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা এবং কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বর্তমান বিএনপি সরকার। দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তবে একটি মহল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে চাইছে।
অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকালে যেভাবে জাতীয় অগ্রগতির পথে চক্রান্ত চালানো হয়েছিল, বর্তমান সরকারের সময়েও একই ধরনের ষড়যন্ত্র চক্রান্ত বজায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিএনপি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বৈরাচারের পতনের ঠিক পূর্বে শত শত ছাত্র ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ওই শহীদদের স্মৃতি অমর করে রাখতে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে ইতিমধ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনকে নিজেদের দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও কয়েকটি দল প্রতিনিধি পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বলেন, ৭১ সালের মতো চব্বিশের জুলাই আন্দোলনেও তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই।
বক্তব্যে রাজশাহী অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া মোকাবিলায় বিএনপি সরকার তিস্তা ও পদ্মায় স্থায়ী ব্যারাজ নির্মাণের দূরদর্শী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের পানির ন্যায্য অধিকার আদায় করতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার পাশাপাশি সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মাঝে সরাসরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক সেবার মাধ্যমে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া উদ্বোধন করেন। রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠের এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশন প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান। সভায় অন্যান্যের মধ্যে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বক্তব্য দেন।
এর আগে মধ্যাহ্নে ১২টার দিকে রংপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে উপস্থিত সুধীজন ও পূজারিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার অতীতের বৈরী রাজনৈতিক ধারায় পরিবর্তন আনতে চায় এবং এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের সাধারণ জনগণ। বর্তমান সরকার যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—সব নাগরিকের সরকার হিসেবে সমানভাবে সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রংপুরের নগর উন্নয়নে দুই সপ্তাহ পূর্বে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকারের অধীন জেলা পরিষদকে কার্যকর করে গ্রামের সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। মন্দিরে পৌঁছালে পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়, যেখানে তিনি শিশুদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেন। তিনি মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের সুবিধার জন্য পেছনে নির্মাণাধীন ভবন দ্রুত সম্পন্ন করতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন।
রংপুরের কর্মসূচি শেষে রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দরে বেলা তিনটায় সামরিক উড়োজাহাজযোগে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে আধা ঘণ্টার মধ্যে তিনি মাদ্রাসা মাঠের জনসভাস্থলে যোগ দেন। রাজশাহীর সভা সম্পন্ন করে একই দিনে আকাশপথে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন তারেক রহমান।
আপনার মতামত লিখুন :