
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার চার নম্বর আসামি খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে (৫৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। ইমিগ্রেশন পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তাঁকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির কাছে ডনকে হস্তান্তর করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া সালমান শাহর পারিবারিক নাম ছিল চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরীর বড় ছেলে সালমান মাত্র ২৫ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার ফ্ল্যাটে মারা যান। সেদিন সকালে তাঁর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। নীলা চৌধুরীর ভাষ্যমতে, সালমানের স্ত্রী সামিরা হক দরজা খুলে তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেননি। পরে বেলা ১১টার দিকে খবর পেয়ে তিনি ছেলের বাসায় গিয়ে দেখেন সালমান বিছানায় পড়ে আছেন এবং তাঁর হাত-পায়ের নখ নীল হয়ে গিয়েছিল।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন, তবে পরিবার শুরু থেকেই একে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত বছর ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের আদেশ দেন। রমনা থানায় করা এই মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্য আসামিরা হলেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
ডনকে আজ আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। আবেদনে বলা হয়, ডন এজাহারনামীয় অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন এবং তাঁকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শুনানি শেষে বিচারক ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে জানান, ১৯৯৭ সালে ক্যান্টনমেন্ট থানায় করা সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণ চেষ্টার মামলার আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে সামিরা হকের সঙ্গে ডনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। সেখানে আরও অভিযোগ করা হয়, ডন, ফারুক ও রেজভি ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে সালমান শাহকে অচেতন করে পরে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি প্রথমবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে একে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছিল। এরপর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয় এবং প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, যেখানেও একে ‘অপমৃত্যু’ বলা হয়। ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল নীলা চৌধুরী মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবার রিভিশন আবেদন করেন। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহকে ‘আত্মহত্যা’র দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে নীলা চৌধুরী এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন জমা দেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর হত্যা মামলাটি নথিভুক্ত হয়।
মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম এই গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এদিকে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সব রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘ডন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে সব। কারা জড়িত সবই বেরিয়ে আসবে। এখনো মেইন আসামি বাকি—সামিরা, সামিরার মা লুসি ইরা। আমি চাই বিচার।’
আপনার মতামত লিখুন :