Facebook Twitter Instagram YouTube

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে বিএনপি


প্রকাশের সময় : জুলাই ৩১, ২০২৬, ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ /
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে বিএনপি

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে কৌতূহল তুঙ্গে। তবে এবার রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে বিএনপি। অতীতের ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে দলটির হাইকমান্ড অত্যন্ত ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। মূলত দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত মনোনয়ন, তবে সিদ্ধান্তটি স্থায়ী কমিটির ফোরামে আলোচনার মাধ্যমেই নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু দলীয় আনুগত্য নয়, বরং দক্ষ, অভিজ্ঞ, সাহসী এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্বকে এবার রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চায় দল। সম্প্রতি দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রেখে দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে বসাতে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সুরে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সবার কাছে শ্রদ্ধেয়, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া হবে, যার ওপর দলের সর্বস্তরের আস্থা রয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সাক্ষাতের পর জল্পনা আরও বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছে—দেশ ও দলের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং সংকটকালীন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সাহস।

রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতায় রয়েছে অম্ল-মধুর ইতিহাস। ১৯৯৬ সালের মে মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসী ভূমিকার কারণে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের একটি অভ্যুত্থান চেষ্টা নস্যাৎ হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের দলীয় আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন। যার পরিণতিতে দেশে এক-এগারোর জরুরি সরকার আসে এবং তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মতে, ইয়াজউদ্দিনের ঘটনা প্রমাণ করে যে শুধু দলীয় আনুগত্য দিয়ে সংকটের সমাধান হয় না।

আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলেও মাত্র সাত মাসের মাথায় দলের সঙ্গে তার চরম দূরত্ব তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা না জানানো, স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়ার নাম উল্লেখ না করা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে তার ছেলের তোরণ নির্মাণের মতো ঘটনার জেরে ২০০২ সালের জুনে তাকে অভিশংসনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি সংসদীয় দল, যার প্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ২০২৪ (2024) সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বি. চৌধুরী ও তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর সব কর্মকাণ্ডই ছিল বিএনপিবিরোধী।

এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্টজন ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও যোগ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, অতীতের বিতর্কিত বা মর্যাদাহীন ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে এবার একজন সৎ ও সর্বজনগ্রাহ্য নাগরিককে রাষ্ট্রপতি করা উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সংকটের সময় রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অন্ধ দলীয় আনুগত্যহীন কাউকে এই পদে আনা দরকার। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যিনি সত্যি সত্যি দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি করা উচিত।’ তার মতে, ‘২০২৪ (2024)-এর অভ্যুত্থানের পরে কী ধরনের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত, কীভাবে হওয়া উচিত, সেটা তো জুলাই সনদের মধ্যে বলা আছে। আমি বলব, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হোক। কিন্তু সেটাও তো হবে না। কারণ, উচ্চকক্ষ হচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি আগের নিয়মেই হবে।’ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রপতিকে হতে হবে খাঁটি দেশপ্রেমিক, দলনিরপেক্ষ এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এ পর্যন্ত ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে বি. চৌধুরী বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানে পতন ঘটে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও আওয়ামী লীগের কাছে 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে চিহ্নিত হন। আর সদ্য বিদায়ী মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হলেও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার প্রতি তার দুর্বলতা ও নানা বিতর্ক তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। easements এসব ইতিহাস পর্যালোচনা করেই বিএনপি এবার সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক ও বিতর্কহীন পথে এগোতে চাইছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor