
অস্ট্রেলিয়ার ‘মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি’র যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো দ্রুত কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। গত ২০ জুলাই ‘জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বিশ্বের ৮২টি দেশের ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সী ১ লাখ ৬ হাজার ৫৮১ জন শিশুর সংক্রমণের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী হওয়ার এই প্রবণতা আগামী এক দশকে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা সাধারণ সংক্রমণেও শিশুদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা নবজাতক ও শিশুরা এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার দেশগুলো এই সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি রয়েছে। এমসিআরআই-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণাপত্রের সহ-লেখক ড. পেনেলোপি ব্রায়ান্ট জানান, সেপসিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রমণগুলো এই ঝুঁকি বাড়ার প্রধান কারণ। এর মূলে রয়েছে ‘অ্যাসিনেটোব্যাকটেরিয়া ব্যোম্যানি’ নামের একটি ব্যাকটেরিয়া, যার ওষুধ প্রতিরোধ সক্ষমতা বেশি। পাশাপাশি মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যকৃতে পুঁজের জন্য দায়ী ‘ক্লেবসিলা’ ব্যাকটেরিয়াও দ্রুত ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানগত মডেলিং অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘লাস্ট-লাইন’ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। তখন ‘অ্যাসিনেটোব্যাকটেরিয়া ব্যোম্যানি’র ক্ষেত্রে এই হার ৮২ শতাংশ এবং ‘ক্লেবসিলা’র ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ড. ব্রায়ান্ট উল্লেখ করেন, কেবল গুরুতর ব্যাধি নয়, বরং শিশুদের মূত্রনালীর সংক্রমণের মতো সাধারণ রোগের ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তিনি জানান, শিশুদের জন্য সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক বা নির্দেশিকা তৈরির ঘাটতি রয়েছে, কারণ অনেকেরই শিশুদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর অনিচ্ছা থাকে এবং শিশুদের ওষুধ তৈরি করা অনেক সময় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক হয় না।
গবেষকরা ‘এএমআর ইন কিডস’ নামের একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন, যা নতুন হুমকি চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। ‘অস্ট্রেলিয়ান সোসাইটি ফর ইনফেকশাস ডিজিজেস’-এর সভাপতি অধ্যাপক ক্রিস ব্লাইথ এই গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এই সংকট তৈরি হচ্ছে। অধ্যাপক ব্লাইথ আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ওষুধে সংক্রমণ না সারায় তাকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিযুক্ত শক্তিশালী ওষুধ বেছে নিতে হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :