
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সরকারি ঋণের পাহাড় এবং সহিংস বিক্ষোভ বিশ্বজুড়ে নতুন করে এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি কি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও? যদিও দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু মিল পরিলক্ষিত হয়, তবুও তাদের কাঠামোগত ভিন্নতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় অবস্থানের কারণে ঝুঁকির প্রকৃতি এক নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ফ্রান্সের মতো আর্থিক বা রাজনৈতিক সংকটের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি পুনরাবৃত্তি যুক্তরাষ্ট্রে ঘটবে—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। ফ্রান্সের সংকট কেবল রাজপথের বিক্ষোভ বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূলে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বাজেট ঘাটতি, ক্রমবর্ধিষ্ণু সরকারি ঋণ, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব। চলতি বছর ফ্রান্সের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বাজেট প্রণয়ন জটিল হয়ে পড়েছে, যেখানে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬.৪ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ৫৪ বিলিয়ন ইউরোর সাশ্রয়ী পরিকল্পনার কথা বললেও ঘাটতি ৫ শতাংশের উপরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া, ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরকারি ঋণের বোঝা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। যদিও দেশটির অর্থনীতি ফ্রান্সের চেয়ে অনেক বিশাল, তবুও ১২৫ শতাংশ ঋণ-জিডিপি অনুপাত, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকে কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সুবিধাজনক অবস্থান হলো আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। বিশ্ববাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সুবিধা ফ্রান্সের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আলাদা সুযোগ দেয়। তবে এই সুবিধা অসীম নয়; ঋণ বাড়তে থাকলে এবং সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি উভয় দেশের জন্যই একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। ফ্রান্সে জনসেবায় অর্থের ঘাটতি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়; রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানসাসে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও জ্বালানি ও ডিজেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট। এএএ-এর তথ্যমতে, কানসাসে পেট্রলের দাম আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতি ভালো চলছে—সরকারি এমন দাবি যখন সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না, তখন সরকারের প্রতি আস্থা কমে যায় এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১০ জুন ২০২৬-এর জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স—উভয় দেশেই গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ অসন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র নিয়ে সন্তুষ্টির হার ২০২৫ সালের ৩৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, দুই দেশের সমস্যার মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক মিলই নেই, বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হতাশারও মিল রয়েছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রও ‘ফ্রান্সের মতো জ্বলবে’ বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, কিন্তু এর পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ৫৯আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫: ১৪
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১০ জুন ২০২৬ প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ফ্রান্সে একই হারে—৬৯ শতাংশ—মানুষ নিজেদের দেশের গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করছে, তাতে অসন্তুষ্ট। ১৬টি উচ্চ আয়ের দেশের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে এ দুটি দেশেই অসন্তুষ্টির হার ছিল অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র নিয়ে সন্তুষ্টির হার ২০
আপনার মতামত লিখুন :