
রাজধানীসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক নিয়মিত ও কার্যকরভাবে ক্লাস নেন না। সিলেবাস শেষ করার নামে দায়সারা পাঠদান কিংবা নানা অজুহাতে শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অনীহা থাকলেও শিক্ষকদের একটি বড় অংশকে প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এসব কোচিংয়ে যেতে উৎসাহিত বা বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রেণিকক্ষের এই ঘাটতি মেটাতে শিক্ষার্থীরা কোচিং, প্রাইভেট বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে অভিভাবকদের যেমন আর্থিক ব্যয় বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবহারও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের ২০২১ সালের ‘সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান : চাহিদা এবং শিক্ষা প্রদানের মধ্যে শূন্যতা’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায়, সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে বঞ্চিত। প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা না পেয়ে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ চড়া মূল্যে কোচিং সেন্টার থেকে শিক্ষা কিনছে, যদিও সেখানেও মানসম্মত শিক্ষার অভাব রয়েছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু জানান, ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করার পর ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিংবাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ করা হলেও দীর্ঘ এক যুগেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি কোচিং বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি জানান। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম অবশ্য স্বীকার করেন যে, করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে এবং অনেক অভিভাবক বাসায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় গাইডলাইন দিতে পারেন না। তিনি ক্লাসের প্রতি আস্থা রেখে কোচিংমুখী না হওয়ার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেটের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি কমছে—এমন অভিযোগের বিষয়েও নজর দেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) গত ১০ জুলাই পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক জরুরি চিঠিতে সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেন্ট্রাল অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে গুগল ফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাউশির পরিচালক জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষার মানোন্নয়নে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, শিক্ষার উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বাজেটে জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কারিকুলাম পরিমার্জন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সম্মানী বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সময়ে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে ঘাটতি ছিল, যা বর্তমান সরকার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাঠপর্যায়ে সরাসরি তদারকি ছাড়া শুধু অনলাইন মনিটরিং কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আপনার মতামত লিখুন :