Facebook Twitter Instagram YouTube

হুতি আক্রমণ মোকাবিলায় সৌদি আরবে সেনা পাঠাতে পারে মিসর


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২০, ২০২৬, ৯:৪২ অপরাহ্ণ / ০
হুতি আক্রমণ মোকাবিলায় সৌদি আরবে সেনা পাঠাতে পারে মিসর

ইয়েমেনের হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তার স্বার্থে দেশটিতে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে মিসর। রিয়াদের সুরক্ষায় মিসরের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যেই পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে পার্লামেন্টে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পার্লামেন্ট থেকে সবুজ সংকেত মিললে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটি সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। এতে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত আরও ব্যাপক রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত শনিবার এক ভাষণে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি পার্লামেন্টের কাছে এই সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন চান। উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সিসি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভাইদের মিসর কখনো ভুলবে না এবং রিয়াদকে রক্ষায় তাঁর সরকার যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মিসর কৌশলগত সংযম বজায় রাখলেও সিসির এই বক্তব্যে নীতির স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে মিসর কৌশলগত সমর্থন দিলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেনি।

কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে মিসরের এই অবস্থান পরিবর্তনের সূচনা অবশ্য বেশ আগেই দেখা গিয়েছিল। গত মে মাসে সিসির সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় সেখানে মিসরের রাফাল যুদ্ধবিমান মোতায়েনের তথ্য আমিরাতের সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, যদিও মিসরের সংবাদমাধ্যমগুলো তা এড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গত আগস্টে সৌদি আরব যখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে, তখন মিসর এতে তাৎক্ষণিকভাবে সই না করলেও যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা জানিয়েছিল। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হুতিদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার পর কায়রোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গতি আসে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসর সফরকালে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বজায় রাখা মিসরের নিজের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য ও জ্বালানির রেকর্ড দাম বৃদ্ধির ফলে মিসরে বর্তমানে দুই অঙ্কের উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে, যেখানে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বহু পরিবারের প্রধান সম্বল। ২০১৩ সালে মিসরের সেনাবাহিনী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কায়রোকে অনুদান, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত হিসেবে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রদান করেছে। প্রেসিডেন্ট সিসিও তাঁর ভাষণে সেই সংকটকালে উপসাগরীয় সহায়তার কথা স্মরণ করেন। উল্লেখ্য, চলতি মাসেই মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা সৌদি আরবের ৫৩০ কোটি ডলারের আমানতের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, যার সঙ্গে কায়রোকে ২৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার সুদও মেটাতে হবে।

অর্থনৈতিক নির্ভরতার পাশাপাশি সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকিও কায়রোকে সক্রিয় হতে বাধ্য করছে। গত জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরের তীরে মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা প্রমাণ করে যে কায়রো এই সংঘাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ারের মতে, কায়রো বুঝতে পারছে তারা অনির্দিষ্টকাল নীরব দর্শক থাকতে পারবে না এবং বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তাদের জন্য অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। তা ছাড়া সৌদি তেলের বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং সুয়েজ খালের শত শত কোটি ডলারের মাশুল রক্ষা—উভয় দেশের জন্য অপরিহার্য। মিসরীয় রাজনৈতিক গবেষক শেরিফ আরেফ উল্লেখ করেছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এখন মিসরের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ।

আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে মিসরের কয়েক লাখ সক্রিয় সেনা এবং শক্তিশালী নৌ ও বিমানবহর রয়েছে। মার্কিন তৈরি এফ-১৬, ফরাসি রাফাল এবং রুশ মিগ-২৯ সমৃদ্ধ মিসরীয় বিমানবাহিনী বেশ আধুনিক। প্রতিবছর ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পাওয়া ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে মিসর মার্কিন সরঞ্জাম কেনে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর মিসরের 'সহায়ক ভূমিকা' বিবেচনায় ওয়াশিংটন সম্প্রতি কায়রোর সামরিক সহায়তায় মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করেছে। বিদেশের মাটিতে সেনা অভিযানের অভিজ্ঞতাও মিসরের রয়েছে; ২০১১ সালে হোসনি মোবারকের পতনের পর সিনাইয়ে জঙ্গি দমন, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি জোটের হয়ে বিমান ও নৌ অভিযান এবং লিবিয়ায় আইএস আস্তানায় হামলা তার প্রমাণ। তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত থেকে ইরাকি সেন হটাতে গঠিত মার্কিন জোটে যোগ দেওয়ার পর মিসর আর বড় পরিসরে বিদেশে পদাতিক সেনা পাঠায়নি। তার আগে ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের আমলে ইয়েমেনে সেনা পাঠিয়ে বড় খেসারত দিতে হয়েছিল মিসরকে, যাকে বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদন পেলেও মিসর সম্ভবত ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি পদাতিক সেনা পাঠাবে না। আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান সমির রাঘেব মনে করেন, মিসরের সহায়তা মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা এবং লোহিত সাগরে নৌ টহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যাতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো ও বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ সতর্ক করে বলেছেন, হুতিদের ভৌগোলিক সুবিধা ও ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে কেবল বোমা হামলা চালিয়ে এ সংকট মেটানো কঠিন। মিসর যুক্ত হলে রিয়াদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা হয়তো বাড়বে, তবে কায়রোকে হুতিদের ওপর হামলার রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo