
বিশ্বজুড়ে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও ব্যাপকতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আগে তাপপ্রবাহ ছিল বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পস্থায়ী ঘটনা, কিন্তু বর্তমানে তা বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কখনো কখনো মাসের পর মাস স্থায়ী হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ‘তাপঝড়’ বা হিট স্টোর্ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় থাকত, যা চলতি দশকে বেড়ে গড়ে ১০২টিতে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় দশকের পৃথিবীর ১০ লাখেরও বেশি ভৌগোলিক এলাকার দৈনিক তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে। এই গবেষণায় দুই ডজন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামত নেওয়া হয়।
সংস্থাটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো স্থানে টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ ধরা হয়। আর এই তাপপ্রবাহ যখন পৃথিবীর মোট আয়তনের অন্তত এক শতাংশ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তাকে তাপঝড় বলা হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশকের সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি ৪৬ দিন স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর প্রায় ছয় শতাংশ এলাকা প্রভাবিত করেছিল। বিপরীতে, চলতি দশকের সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি ৩৬৭ দিন স্থায়ী ছিল এবং পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছে।
তাপঝড়ের নেতিবাচক প্রভাব কেবল অসহনীয় গরমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খরা ও দাবানল বাড়িয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী তাপঝড়ের সময় সৌদি আরবের মক্কায় হজের সময় তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল, যাতে ১৩০০ জনের বেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানল এবং লিবিয়ার দেরনা শহরে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো বিপর্যয় দেখা দেয়। এছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও তীব্র দাবদাহে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, ১৯৬০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পরিস্থিতিও তাপঝড়কে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের অধ্যাপক জেমস রেনউইকের মতে, তাপঝড় বৈশ্বিক সভ্যতার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘রাইমুন্ডো’ নামের তাপঝড়টি পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু ঝুঁকিগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এই তাপঝড়গুলো দৈনন্দিন জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও প্রত্যক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
আপনার মতামত লিখুন :