উন্নত জীবনের আশায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে গত ৭ মে একসঙ্গে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত কাজ না দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ৩০ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে আছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দুজন দেশে ফিরে আসতে পারলেও বাকি দুজন গুরুতর আহত হয়ে রাশিয়ার পৃথক দুটি হাসপাতালে ভর্তি থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন।
আহতদের একজন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মো. আলী হাসান সোহেল। তিনি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে গত ১ মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসাধীন। ভিডিও কলে যোগাযোগের সময় কান্নাভেজা কণ্ঠে আলী হাসান বলেন, এই জীবন কেউ চায় না। বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে সুস্থ হলে দেশে ফেরানোর চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সুস্থ হলেই আবার যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। এক বছরের মধ্যে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা আলী হাসান যেকোনো উপায়ে তাঁকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
প্রতারণার শিকার এই কর্মীদের তিন ভাগে ভাগ করে সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে আলী হাসান ছিলেন ১৬ জনের একটি দলে। মাত্র পাঁচ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে তাঁদের পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তিন দিন ধরে মাইলের পর মাইল হেঁটে এবং শুকনো খাবার খেয়ে মাটির নিচের একটি সুড়ঙ্গ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান তাঁরা। পরে তাঁদের দলের বাকি ১১ জনও সেখানে যোগ দেন। পরবর্তীতে শরীরে সেনার পোশাক ও হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাঁদের একে একে সামনের সারিতে পাঠানো হয়। এই ১৬ জনের দলের মধ্যে বর্তমানে ১৪ জন নিখোঁজ এবং বাকি দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আলী হাসান জানান, যুদ্ধে যেতে রাজি না হলে বন্দি করে মারধর ও শাস্তি দেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের যেতে বাধ্য করে। অস্ত্র দিয়ে তাঁদের মূলত টোপ বা মরণফাঁদ হিসেবে সামনে-পিছে বা ডানে-বাঁয়ে চলাফেরা করতে বলা হতো। আর এই নির্দেশ মেনে এগোলেই ইউক্রেনের ড্রোন হামলার শিকার হতে হতো কর্মীদের। হামলায় অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন, আর যাঁরা আহত হয়ে ফিরতে পেরেছেন তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আলী হাসানের সঙ্গে প্রথম দফায় যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া পাঁচজনের দলে ছিলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মো. পলাশ শেখ। উন্নত জীবনের আশায় চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে রাশিয়ায় গিয়ে তিনি প্রতারণার শিকার হন। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় এক হাত উড়ে যাওয়ার পর পলাশ গত ২৪ দিন ধরে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম জানান, এক হাত না থাকায় হয়তো পলাশকে আর যুদ্ধে পাঠানো হবে না। তিনি যেকোনো উপায়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরতে চান এবং দূতাবাসও সুস্থ হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
নিহত ও আহতদের উদ্ধারে পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ও সরকারি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। গত ২৬ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পৃথক আবেদন জমা দেন আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন এবং পলাশ শেখের বোন চুমকি খানম। আবেদনে বলা হয়, ঋণের কিস্তি ও পাওনাদারদের চাপে তাঁদের পরিবার চরম সংকটে রয়েছে। তাই আহতদের উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে আহতদের সরাসরি যোগাযোগের বিষয়ে ভিন্ন কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। মস্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং দেশে ফিরতে চান—এমন কেউ এখনো সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে দেশে ফেরানোর আবেদন জানাননি। একই সঙ্গে জানা গেছে, রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বাংলাদেশি কর্মীদের লাশ দেশে আনা হয় না এবং পরিবারগুলোও কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।
বেসরকারি অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রামরুর (RMRRU) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবিলম্বে রাশিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসাধীন দুজনের পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁদের যাবতীয় চিকিৎসা খরচ, পাওনা ও ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করার পাশাপাশি সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া বৃদ্ধি পায়। বিগত তিন বছরে এটি কয়েক গুণ বাড়লেও অনেক কর্মী গিয়েই মূলত যুদ্ধের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যার সঠিক কোনো সরকারি হিসাব না থাকলেও অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। রাশিয়ায় কাজের কথা বলে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত রুশ দূতাবাসের কাছে ই-মেইলে বক্তব্য চাওয়া হলেও তা এখনও পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :