Facebook Twitter Instagram YouTube

কক্সবাজারে একরাম হত্যা মামলা: বাদীর অজান্তে ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর অভিযোগ


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২২, ২০২৬, ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ / ০
কক্সবাজারে একরাম হত্যা মামলা: বাদীর অজান্তে ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর অভিযোগ

কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজের সামনে সমিতি বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে হওয়া মোহাম্মদ একরাম হত্যাকাণ্ডের মামলায় চরম জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনার মূল চিত্র ও ভিডিও ফুটেজে অন্য ব্যক্তিদের হামলায় অংশ নিতে দেখা গেলেও, মামলার বাদীর সম্পূর্ণ অজান্তে জাকির হোসেন নামের স্থানীয় এক সৈকত ব্যবসায়ীকে প্রধান আসামি হিসেবে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই জালিয়াতির বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে নিহতের পরিবার পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছে এবং কারাবন্দি ব্যবসায়ীর স্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরতলীর সিটি কলেজ এলাকায় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে মোহাম্মদ একরামের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় মুবিন ও বাবু নামের দুই যুবক একরামকে লক্ষ্য করে পরপর গুলি বর্ষণ করে। একই সঙ্গে মোহাম্মদ সোহেল ওরফে রহমত নামের অপর এক যুবককে গুলি করতে করতে ধাওয়া করা হয়। এ ঘটনায় রহমত প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত অবস্থায় রক্তাপ্লুত একরামকে উদ্ধার করে প্রথমে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর একরাম মারা যান।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নিহত একরামের বাবা জালাল আহমদ দ্রুত বিচার আইনে মামলা করতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় যান। অভিযোগ রয়েছে, থানা ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে উপপরিদর্শক (এসআই) মিঠুন পালিতসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা রাইটার দারুস সালামের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী একটি এজাহার প্রস্তুত করেন। ওই সময় আসামি পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় ‘বিরোধীপক্ষ’ থেকে কলাতলী ও সুগন্ধ্যা এলাকার ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়। এরপর এজাহারে অন্য আসামিদের পিতা-মাতার পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না থাকলেও, কেবল জাকিরের নাম, পিতা-মাতার নাম ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নিখুঁতভাবে যুক্ত করে তাকে মূল অভিযুক্ত করা হয়। অনুসন্ধানকালে জানা যায়, কম্পিউটার অপারেটর যখন এজাহার লিখছিলেন, তখন পাশে বসা এক পুলিশ কর্মকর্তা ফোনে কার সঙ্গে যেন বলছিলেন, ‘জাকিরের আইডি কার্ড পাওয়া গেছে, ঠিক আছে, ঠিক আছে!’

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে, সাতকানিয়ার করাইয়াঘোনা এলাকার মুজিব চেয়ারম্যানের সঙ্গে ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের কলাতলী এলাকার জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরে মুজিব চেয়ারম্যান তাকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এজাহারে জাকিরের নাম ঢোকানোর পাশাপাশি মুজিব চেয়ারম্যান ও মোহাম্মদ ফারুক নামের এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যাশায়ী একরামের কাছে যান। সেখানে তারা মৃত্যুশয্যায় থাকা একরামকে ভয়ভীতি ও জোরজবরদস্তি করে জাকির হোসেনের নাম বলিয়ে ভিডিও রেকর্ড করার চেষ্টা করেন, যার অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের সংরক্ষিত রয়েছে।

২ সেপ্টেম্বর রাতে সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিল্লাল হোসেনের নথিভুক্ত করা সেই এজাহারে দেখানো হয়, জাকির হোসেনের হুকুম ও নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং তিনি নিজে উপস্থিত থেকে একরামকে ছুরি মেরেছেন। অথচ মামলার বাদী জালাল আহমদ এবং তার দুই ছেলে জাবের ও আবছার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে আবুল মনছুর ওরফে লুদু এবং প্রধান গুলি বর্ষণকারী মুবিনের নাম এজাহারের দুই নম্বরে থাকার কথা ছিল। পুলিশ সেই তথ্য পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নিরপরাধ জাকির হোসেনকে ফাঁসিয়ে এজাহার এলোমেলো করে দিয়েছে, যাকে বাদী বা তার পরিবার চেনেনও না।

জালিয়াতি ও অনিয়মের খবর প্রকাশের পর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবার ও বাদীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি অধিকতর ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) ন্যস্ত করা হয়েছে। পুলিশ সুপার তার অফিসিয়াল ফেসবুক পাতায় নিহত একরামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ছবি প্রকাশ করে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিঠুন পালিতের বিরুদ্ধেও বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি এজাহারে জাকির হোসেনের নাম জালিয়াতি করে ঢোকানোর বিষয়টি শুরু থেকেই অবগত থাকা সত্ত্বেও নিজে তাকে গ্রেফতার না করে র‌্যাব-১৫ (বর্তমানে এসআরবি)-কে সম্মতি দিয়ে তাকে আটক করান। এছাড়া ঘটনার অন্যতম মূল অভিযুক্ত ও মূল শুটার মুবিন গ্রেফতার হওয়ার পর, তাকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার বা ঘটনার বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা না করে থানা হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh