Facebook Twitter Instagram YouTube

হরমুজ প্রণালিতে সংকট: আরব দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ


প্রকাশের সময় : জুলাই ১০, ২০২৬, ৯:০১ অপরাহ্ণ /
হরমুজ প্রণালিতে সংকট: আরব দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগের সপ্তাহেও বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের ৩৮ শতাংশ এই পথেই সম্পন্ন হতো। একই সঙ্গে এলপিজি ও এলএনজির ২৯ শতাংশ, পরিশোধিত তেল পণ্যের ১৯ শতাংশ এবং সারসহ রাসায়নিক বাণিজ্যের ১৩ শতাংশ এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হতো। তবে হরমুজ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নৌ চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে যায়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প রুটগুলো এই ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে; এগুলো কেবল কিছু সার, কনটেইনার এবং ড্রাই বাল্ক বাণিজ্যের সংকুলান করতে পেরেছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল শুরু হলেও জাহাজে হামলা এবং নতুন সার্ভিস চার্জের বিতর্ক ভবিষ্যতে যাতায়াতকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য রুটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। যদিও অনেকে মনে করছেন বিকল্প রুটগুলোর গুরুত্ব বাড়বে, তবে বাস্তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সহজ নয়।

তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার সমুদ্রবাহিত নেট রপ্তানি প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল বাড়ালেও, এশিয়ার শোধনাগারগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের মিডিয়াম থেকে হেভি-সোয়ার গ্রেডের তেলের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের লাইটার ও সুইটার গ্রেডের তেল ব্যবহারে শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ও মুনাফা কমেছে। তাছাড়া দূরবর্তী বাজার থেকে তেল আমদানিতে পরিবহনভাড়া, সময় ও বিমা খরচ অনেক বেশি। জুনের মধ্যে বিশ্বজুড়ে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কম পরিশোধিত হচ্ছিল, যার প্রভাব পড়েছে পেট্রোকেমিক্যাল বাজারেও। এলপিজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে; মার্কিন প্রোপেনপ্রধান এলপিজি ভারতের মতো দেশের আবাসিক খাতের জন্য রূপান্তর ছাড়া ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল।

এই সংকটের প্রতিক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী বছরের মধ্যে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল ক্ষমতার দ্বিতীয় পাইপলাইন চালু করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি তারা পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল পরিবহনে সক্ষম মাল্টিফুয়েল পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা করছে। সৌদি আরব তাদের ১ কোটি ২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প খুঁজছে এবং সৌদি আরামকো বিশ্বজুড়ে তেল মজুত রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা ভাবছে। কুয়েতও একই ধরনের অংশীদারত্বের সম্ভাবনা যাচাই করছে, আর ইরাক বসরা ও হাদিসাকে যুক্ত করে নতুন পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছে।

তেলের বাইরে জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশকে যুক্তকারী রেলওয়ে প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর সঙ্গে ট্রাক পরিবহনব্যবস্থাও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা রয়েছে—কাতার এলএনজি নিয়ে নতুন কোনো ঘোষণা দেয়নি এবং আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন বাস্তবায়ন রাজনৈতিক জটিলতায় দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। যুদ্ধের ফলে বেসামরিক স্থাপনাগুলো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য মূল শিক্ষা হলো নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা, কারণ ভবিষ্যতে যেকোনো নৌপথই যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।