
ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (এনইইটি)-এর প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে চলমান তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার (২৫ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনি নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান উল্লেখ করেন, বিগত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। তিনি জানান, এটি কোনো ব্যক্তিগত সম্মান বা ভাবমূর্তির বিষয় নয়, বরং দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও তরুণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন। দেশের গণতন্ত্রের শক্তি এবং তরুণদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিজের অটল বিশ্বাসের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরাই ভারতের ভবিষ্যৎ এবং উন্নত ভারত গড়ার কারিগর।
বিদায়ী এই শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ভারতের তরুণ সমাজ যেন কোনো বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে না পড়ে, তা বিবেচনা করেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান আন্দোলনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যেন দেশের ঐক্য নষ্ট করতে না পারে। একই সঙ্গে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী যেন আইনি জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে, সেদিকেও তিনি নজর রাখার আহ্বান জানান। পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশের সেবা করাই সবসময় তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল এবং ভবিষ্যতে তিনি ওডিশার জনগণ ও দেশের তরুণদের কল্যাণে কাজ করে যাবেন।
গত জুনের শুরু থেকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০ জুলাই আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করে, যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী দিল্লির যন্তর-মন্তরে সমবেত হয়ে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দেন। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ছাত্র ও যুব আন্দোলন। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই বিক্ষোভ পরবর্তীতে রাজধানী দিল্লির বাইরে মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন প্রধান শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের সময় বেশ কিছু স্থানে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনা ঘটলেও সিজেপি নেতারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
ভারতের মেডিকেল কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো একাধিক তদন্ত শুরু করে এবং তা আদালতের নজরেও আসে। এই পরিস্থিতির মধ্যে গত ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, সরকারি পরীক্ষার পবিত্রতা নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর শাস্তি’ নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সংসদীয় দলের বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া বার্তা সংবাদমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশন করার সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে তার অনশন ভাঙার আহ্বান দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া আন্দোলন তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলও এতে সমর্থন জানায়। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নিট পরীক্ষার অনিয়মের তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের এই আন্দোলন শুধু নিট পরীক্ষার অনিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দেশের তরুণদের বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধানের একটি বৃহত্তর লড়াই।
আপনার মতামত লিখুন :