Facebook Twitter Instagram YouTube

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক: তদন্তে ডিভাইস চায় ডিবি, নিরাপত্তায় চিন্তা বাদীর


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ / ০
জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক: তদন্তে ডিভাইস চায় ডিবি, নিরাপত্তায় চিন্তা বাদীর

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর আট মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে তদন্ত পরিচালনা করছে ঢাকা মহানগর ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। মামলাটি সুরাহার জন্য জামায়াত আমিরের ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ডিভাইস চেয়ে বাদীপক্ষকে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে এসব ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতিও নেওয়া হয়েছে, তবে সেগুলো এখনো তদন্তকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাইবার হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে ব্যবহারকারীর নিজস্ব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে কখন, কোথা থেকে এবং কীভাবে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছে, তার নিখুঁত প্রযুক্তিগত তথ্য যেমন লগইন ও সেশন হিস্ট্রি পাওয়া সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ডিভাইসে কোনো ম্যালওয়্যার বা ফিশিং লিংকের উপস্থিতি ছিল কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলো না পাওয়ায় তদন্তের বেশ কয়েকটি মূল প্রশ্নের সুরাহা আটকে রয়েছে।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম জানান, আদালতের থেকে ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে কমপক্ষে তিনবার আলামত ও তথ্য চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাদীর পক্ষ থেকে সেসব ডিভাইস জমা দেওয়া হয়নি। অবশ্য আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশের তারিখ বা বাদীকে সর্বশেষ কোন তারিখে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারেননি এই কর্মকর্তা। আদালতের নথি অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ডিভাইস জব্দ ও ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমোদন প্রদান করেন। আগামী ৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াত আমিরের পক্ষে মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম ডিবির চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তারা ডিভাইস দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন না। তবে আমিরের ডিজিটাল ডিভাইসের নিরাপত্তা ও ভেতরের উপাত্তের সুরক্ষা নিয়ে তাঁদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে ডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই দুই দফা বৈঠক হয়েছে। তাঁদের প্রস্তাব, তদন্ত কর্মকর্তা চাইলে তাঁদের নিজস্ব উপস্থিতিতেই সরাসরি ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করতে পারেন। এ ছাড়া মামলা দায়েরের সময়েই বাদীপক্ষের নিজস্ব গবেষণায় পাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে সরকারি সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কোনো স্থান থেকে হ্যাকিং হয়ে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত রয়েছে।

ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, গত ৩১ জানুয়ারি বিকেলে জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডল থেকে ইংরেজিতে একটি বিতর্কিত পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে আনা হলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন, যা পতিতাবৃত্তিরই অন্য এক রূপ। পোস্টটি প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয় এবং রাজপথে বিক্ষোভ গড়ায়। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এই বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, এটি কর্মজীবী নারীদের জন্য চরম অবমাননাকর।

পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি মেইল ব্যবহার করে দলীয় আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ তোলে দলটি। এ ঘটনায় প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের (বঙ্গভবন) সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ডিবি পুলিশ ছরওয়ারকে আটক করে এবং পরদিন গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়, তবে ওই দিনই তিনি আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।

মামলায় আসামি হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারে আলমের ব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করে তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি পুলিশ। ছরওয়ারের দাবি অনুযায়ী, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও জব্দ করার প্রায় এক মাস পর ফেরত দেওয়া হয়। তবে এসব ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো পুলিশের হাতে এসে পৌঁছায়নি। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে এক্স (টুইটার) কর্তৃপক্ষের কাছেও অফিসিয়াল তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও সেখান থেকেও কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

শুরু থেকেই নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আসা ছরওয়ারে আলম নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, জামায়াত আমিরের হ্যাকিংয়ের ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিরোধীদলীয় নেতারা তদন্তে সহযোগিতা না করায় মামলাটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়ার কারণে তিনি চাকরিতে ফিরতে পারছেন না এবং চাকরির মেয়াদ আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকায় পেনশন ও আর্থিক সুবিধা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। নিজেকে এই ঘটনার ‘বলির পাঁঠা’ দাবি করে দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার চান তিনি।

পুরো বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী মত প্রকাশ করেন যে, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে যেকোনো মামলায় বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষেরই তদন্ত সংস্থাকে পূর্ণ সহযোগিতা করা উচিত। মামলার কারণে যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। আট মাসের বেশি সময় পার হলেও বাদীপক্ষের ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা ও এক্স কর্তৃপক্ষের জবাব না মেলায় মূল সাইবার হামলার উৎস এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত থেকে গেছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo