
টানা অবরোধ, ধর্মঘট এবং মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের (আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর-এজেকে) বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পুঞ্চ বিভাগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত ৫ জুন থেকে পুরো অঞ্চলে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংকটের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে পুঞ্চ বিভাগের কেরি কোট গ্রামের বাসিন্দা জহির ইকবালের অভিজ্ঞতায়। গত জুনের মাঝামাঝি তার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় স্বজনরা তাকে কাঁধে করে দীর্ঘ পথ হেঁটে প্রধান সড়কে নিয়ে আসেন। পরে প্রতিবেশীদের মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহার করে বন্ধুর গাড়িতে করে ১০ কিলোমিটার দূরের হাজিরা সরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে পরামর্শ পেয়ে ১৪০ কিলোমিটার দূরের ইসলামাবাদে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। জহির ইকবাল জানান, বিক্ষোভের পর থেকে কাজ প্রায় নেই বললেই চলে, আত্মীয়দের পাঠানো অর্থেই সংসার চলছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত গত জুনে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) নিষিদ্ধ করার পর। সংগঠনটি কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আইনসভার ১২টি আসন বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছিল। এরপর কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আগামী ২৭ জুলাই অঞ্চলটিতে আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও পুঞ্চের বাসিন্দাদের কাছে নির্বাচন নয়, বরং পথ অবরোধ ও ইন্টারনেট বন্ধই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুদনোতি জেলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মালিক নিয়াজ আহমদ জানান, সড়ক অবরোধের কারণে সরকারি ভর্তুকির গম সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যে আটা ২ হাজার ২০০ রুপিতে পাওয়ার কথা, তা এখন ৬ হাজার রুপিতে কিনতে হচ্ছে। মুজাফফরাবাদের মুদ্রণ ব্যবসায়ী মালিক দাউদ জানান, ইন্টারনেট না থাকায় ব্যবসায়িক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি পাকিস্তানি রুপির ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সুর শোনা গেছে আইনজীবী উসমান গুলের কণ্ঠে, যিনি ইন্টারনেট না থাকায় এটিএম থেকে টাকা তুলতে না পেরে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান স্থগিত করতে বাধ্য হন।
শিক্ষাক্ষেত্রেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। পাল্লানদারি এলাকার সরকারি স্নাতকোত্তর কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ খান জানান, ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার তিনটি পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। নতুন তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় পুরো একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। এদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নির্বাচনী প্রচার চলছে, তবে পুঞ্চ ও সুদনোতির বাসিন্দারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :