Facebook Twitter Instagram YouTube

মক্কা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ: নতুন প্রতিরক্ষা জোটের বিস্তারিত


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ণ / ০
মক্কা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ: নতুন প্রতিরক্ষা জোটের বিস্তারিত

তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ মঙ্গলবার তুরস্ক সরকার দেশটির সংসদে জমা দিয়েছে। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা, যা ন্যাটো জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতোই সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার ধারণ করে। গত আগস্ট মাসে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উপস্থিত ছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এককভাবে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ সংগ্রহ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত দেশকে অন্য দেশগুলো সামরিক সক্ষমতাসহ পারস্পরিক সহায়তার সব উপায় কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা করবে। চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, তবে কোনো সদস্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সশস্ত্র হামলা হলে অন্য দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করতে বলা হয়েছে।

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হুমকি বা বিপদের মুখে পড়ে, তবে সেই হুমকি দূর করতে সদস্য দেশগুলো প্রয়োজনীয় সব উপায় ব্যবহার করবে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে অন্য সদস্যরা। এই সহায়তার ধরন ও পরিধি প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে এবং সদস্য দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে সহযোগিতা করবে, যার মধ্যে সামরিক উপায় ও সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জাতিসংঘের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করাও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৬টি অনুচ্ছেদে গঠিত এই চুক্তিতে শুধু পারস্পরিক সামরিক সহায়তার অঙ্গীকারই নয়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, পক্ষগুলো প্রতিরক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প ও নিরাপত্তা খাতে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করবে; তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন করবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে সম্মত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়াবে। এর মধ্যে রয়েছে: ১. প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া; ২. বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন এমন প্রযুক্তিতে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন বাস্তবায়ন; ৩. যেকোনো পক্ষের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পক্ষগুলোর ভূখণ্ডে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সামরিক শিল্পকে সহায়তা করা; এবং ৪. প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও অর্জিত শিক্ষা বিনিময় করা। যুদ্ধ ও শান্তিকাল উভয় সময়েই দেশগুলো সামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করতে পারবে, যার লক্ষ্য তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো।

চুক্তিতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তিন দেশ সহযোগিতা করবে। এছাড়াও, পারস্পরিক সম্মত নিরাপদ মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে দেশগুলো, যেখানে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত উপাত্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সদস্য দেশগুলো শান্তিকাল, যুদ্ধকাল ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে পরস্পরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে, তবে এই সহযোগিতা নির্ভর করবে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের ওপর।

চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে একটি ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কমিটিতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন। কমিটির দায়িত্ব হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করা। কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে এবং পালাক্রমে তিন দেশের একেকটি দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারা বছরে একবার বৈঠক করতে পারবেন। মূল তিন দেশের সর্বসম্মতিতে এই চুক্তিতে অন্য দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিও নির্ধারণ করতে পারবে কমিটি।

চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মহাসচিব তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক। চুক্তিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ রাখা হয়নি, অর্থাৎ এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্যদেশ এটি থেকে সরে যেতে পারবে না। ১০ বছর পার হলে কোনো দেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্য সদস্যদেশগুলোকে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে। চুক্তির আওতায় পাওয়া গোপনীয় তথ্য ও নথির সুরক্ষা প্রত্যাহার বা চুক্তির অবসানের পরও বজায় রাখতে হবে। একইভাবে, চুক্তি শেষ হওয়ার আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের ওপর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে না। চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে সদস্য দেশগুলো আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধান করবে। চুক্তিতে সংশোধন আনতে হলে মূল তিন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের নিজ নিজ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির সচিবালয়ে অনুমোদনের সর্বশেষ দলিল জমা দেওয়ার দিন থেকে এটি কার্যকর বলে গণ্য হবে। তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় চুক্তিটির তিনটি মূল কপি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনটি ভাষার পাঠ সমানভাবে প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হলেও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দিলে ইংরেজি পাঠকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor