
নবজাতকের ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মোচড়ামুচড়ি করা এবং মুখ লাল হয়ে যাওয়া অনেক নতুন মা-বাবার মনে আশঙ্কার সৃষ্টি করে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যাকে 'বেনাইন স্ট্রেচিং' বলা হয়। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক কারণ এবং পরিচর্যা সম্পর্কে জানা জরুরি।
মাতৃগর্ভে দীর্ঘ সময় গুঁটিশুঁটি হয়ে থাকার পর ভূমিষ্ঠ হয়ে হাত-পা ছড়ানোর স্বাভাবিক চেষ্টার ফলেই মূলত শিশু এমন আচরণ করে থাকে। এর পাশাপাশি, নবজাতকের স্নায়ুতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত না হওয়া এবং ঘুমের ৫০ শতাংশ সময় 'অ্যাক্টিভ স্লিপ' বা চঞ্চল ঘুমে কাটানোর কারণে ঘুমের ঘোরে মুখ বাঁকানো বা শরীর মোচড়ানো খুবই স্বাভাবিক। এছাড়া, দুধ খাওয়ার সময় পেটে বাতাস প্রবেশ করলে চাপ সৃষ্টি হয়, যা থেকে শিশু স্বস্তির জন্য মোচড় দিয়ে থাকে। একই সঙ্গে, হঠাৎ চমকে উঠে হাত-পা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি বা 'মোরো রিফ্লেক্স' ৩ থেকে ৪ মাস বয়স পর্যন্ত দেখা যায়।
যদি শিশুর নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ, ঘুম এবং মলমূত্র ত্যাগ স্বাভাবিক থাকে, মোচড়ানোর পর সে শান্ত হয়ে যায় এবং কোনো শারীরিক অসুস্থতা না থাকে, তবে এই মোচড়ামুচড়ি নিয়ে মোটেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
তবে কিছু বিপদচিহ্ন দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মোচড়ানোর পাশাপাশি শিশুর বমি হওয়া, খিঁচুনি, শরীর নীল হয়ে যাওয়া, স্তন্যপানে চরম অনীহা, অনবরত কান্না, শরীর শক্ত হয়ে বেঁকে যাওয়া, জ্বর, শ্বাসকষ্ট কিংবা বয়স অনুযায়ী ওজন না বাড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে কোনো বিলম্ব করা উচিত নয়।
নবজাতকের এই অস্বস্তি দূর করতে মা-বাবাকে কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর শিশুকে কাঁধে নিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পিঠ চাপড়ে ঢেকুর তোলানো অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পজিশন বজায় রেখে দুধ খাওয়ালে পেটে বাতাস কম ঢোকে। শিশুর ত্বক শুকনো রাখতে ভেজা ডায়াপার বা কাঁথা দ্রুত পরিবর্তন করা দরকার। সুতি কাঁথা দিয়ে হালকাভাবে জড়িয়ে রাখলে বা সোয়াডলিং করলে শিশু নিরাপদ বোধ করে এবং ভালো ঘুমায়। শিশু জেগে থাকা অবস্থায় দিনে ২ থেকে ৩ বার কিছুটা সময়ের জন্য পেটে ভর দিয়ে বা টামি টাইম দিলে তার পেশি শক্তিশালী হয়।
তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তেল মালিশ করা, গ্রাইপ ওয়াটার, মধু কিংবা চিনির পানি খাওয়ানো সম্পূর্ণ অনুচিত।
সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাস বয়স পার হলে এই সমস্যাটি আপনা থেকেই দূর হয়ে যায়। তাই অনর্থক ভয় না পেয়ে সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করাই অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব।
লেখক: নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতাল, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।
আপনার মতামত লিখুন :