
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কাছ থেকে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এমন গুঞ্জন ও বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিবাদের মুখে সোমবার রাতে তিনি জানান, সরকার এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভার কার্যবিবরণী ছড়িয়ে পড়ার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ওই সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৫ সালের আইন অনুযায়ী এনটিআরসিএ শুধু শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে এবং ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগের সুপারিশ করবে না। সভার এই অভিমত জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশী ও সমালোচকেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবার দলীয়করণ ও ঘুষ-বাণিজ্য ফিরে আসবে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে এক পোস্টে সতর্ক করে বলেন, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলে সরকারকে বড় ধরনের আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে। তিনি একে স্কুলগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন। অন্যদিকে, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ছাত্রসংগঠন 'ছাত্রপক্ষ' এক বিবৃতিতে একে 'মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ধ্বংসের পাঁয়তারা' বলে উল্লেখ করে। এছাড়া, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ দাবি আদায় না হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানায়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রবেশ পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দিলে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব ও ঘুষের পুরোনো চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে। বর্তমান ব্যবস্থার জটিলতা দূর করে একে আরও স্বচ্ছ করার পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তারা দাবি করে।
তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন পৃথক ফেসবুক পোস্টে সবাইকে গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং খুব শিগগির সঠিক তথ্য জানা যাবে বলে আশ্বস্ত করেন।
অবশেষে রাত ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ফেসবুক পেজ 'এহছানুল হক মিলন মিডিয়া সেল' থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কীভাবে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দর করা যায়, তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করছে। তবে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মন্ত্রী সবাইকে কোনো ধরনের অপতথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ এনটিআরসিএর পরীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তবে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারী পদে নিয়োগ এত দিন পরিচালনা কমিটির মাধ্যমেই হতো। সম্প্রতি এসব পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং এর লিখিত পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :