Facebook Twitter Instagram YouTube

শারীরিক অসুস্থতায় পদত্যাগের পথে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৩, ২০২৬, ৮:৪৭ অপরাহ্ণ /
শারীরিক অসুস্থতায় পদত্যাগের পথে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

অবশেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন সত্যিতে রূপ নিতে যাচ্ছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। বঙ্গভবনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী শনি বা রবিবার নাগাদ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা বিলম্ব ঘটছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে তার পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিতে হবে। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমানে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডে যাওয়া স্পিকারের ২৬ জুলাই ফেরার কথা থাকলেও, দপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব মো. নূরুল আমীন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করা হয়নি। তবে বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, স্পিকার দেশে না থাকায় রাষ্ট্রপতি চাইলেও এখনই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারছেন না। ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি মানসিক কিংবা শারীরিক—যেকোনো কারণেই হোক, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, সরকার রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বলেনি। এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি যদি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তবে সেই সুযোগ তার রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে তখন মাঠ ছিল দারুণ গরম। এমনকি বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবনের কিনারা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’রক্ষায় তখন বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভকারীদের সামাল দিয়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরও সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে সরকারের পাঁচ মাসের মাথায় নতুন করে আবারও তার পদত্যাগের ইস্যুটি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।

রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছেন। সম্প্রতি সিএমএইচে তার এমআরআইসহ একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং চিকিৎসকরা তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় তিনি এখন পদত্যাগের দ্বারপ্রান্তে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই পদত্যাগের বিষয়টি সহজভাবে ভাবছিলেন সাহাবুদ্দিন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রীদের শপথ পড়ানোর পর তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানিয়েছিলেন যে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের ভাষ্যমতে, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন। একইসঙ্গে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলেও সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। এর আগেও রাষ্ট্রপতি ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাবনা টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তাদের একমাত্র সন্তান মো. আরশাদ আদনান।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin