
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হওয়া বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৪১ নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম জানান, রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন সাত মেধাবী নেতাকর্মী। তারা হলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস, ঢাকা ডেন্টাল কলেজের হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোলের রেজওয়ান হোসেন, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজারের শফিকুল ইসলাম। সংগঠনটির অভিযোগ, এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের কারও আটকের কথা স্বীকার করেনি, ফলে পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চরম অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত তুলে ধরা হয় যে, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়াগামী বাস থেকে ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসকে এবং ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার শ্যামলী থেকে হাফেজ জাকির হোসেনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বেনাপোলের দুর্গাপুর বাজার থেকে রেজওয়ান হোসেন, একই বছরের ২৩ অক্টোবর বান্দরবান থেকে জয়নাল হোসেন, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের লেবুতলা থেকে মু. কামরুজ্জামান এবং ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে শফিকুল ইসলামকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম দাবি করেন, গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মী রয়েছেন—যা রাজনৈতিক পরিচয় থাকা ভুক্তভোগীদের ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। নিরাপত্তাহীনতা, ভয় ও নির্যাতনের কারণে অনেকে অভিযোগ করতে না পারায় প্রকৃত গুমের সংখ্যা সাত শতাধিক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে মাইদুল ইসলাম, ইবনুল ইসলাম পারভেজ, আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ, আবুজর গিফারী, শামীম মাহমুদ, হাফেজ মো. জসিম উদ্দীন জিহাদ, মহিউদ্দিন সোহান ও সাইফুল ইসলাম মামুনের নাম উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রশিবিরের অন্তত ১০১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া অনেক নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এক্ষেত্রে জয়পুরহাট জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর ঘটনা তুলে ধরা হয়, যাদের ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তুলে নেওয়ার পর নির্যাতন করা হয় এবং চিকিৎসায় অবহেলার কারণে পা কেটে ফেলতে হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, বিগত সময়ে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার ৮২৬টি রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট র্যাব সদর দপ্তরে গিয়েও কোনো সদুত্তর পায়নি। পরবর্তীতে ওয়ালীউল্লাহ, মুকাদ্দাস, জাকির হোসেন, জয়নাল আবেদীন, রেজওয়ান হুসাইন ও কামরুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে র্যাব ও ডিবির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ করা হয়। একই বছরের ১৭ নভেম্বর আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী মাইদুল ইসলাম ও ইবনুল ইসলাম পারভেজসহ কয়েকজনের ঘটনা তুলে ধরেন। তার দাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম ও ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমানকে ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি ডিবি তুলে নেয়। পরে আতিকুর রহমানের লাশ পাওয়া যায় এবং মাইদুলকে হত্যার পর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরিবার প্রায় ৫০ দিন পর এ বিষয়ে জানতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
আপনার মতামত লিখুন :