
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের দুর্বলতা বড় প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে সামগ্রিক পাশের হার গত বছরের তুলনায় ৬.২ শতাংশ কমে ৬২.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আওয়ামী সরকারের ১৭ বছরের ইতিহাসে এটি সর্বনিম্ন পাশের হার। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে ২৭ শতাংশ এবং গণিত বিষয়ে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় বেশি। এছাড়া ৯টি সাধারণ বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে ১৯ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে।
সোমবার সকালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন, যা গত বছরের ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জনের তুলনায় ১৯ হাজার ৯ জন কম। তবে এবারের ফলাফলে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে; তাদের পাশের হার ছেলেদের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৭১.৬৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ ৩৩২৫৩ জন; রাজশাহীতে পাশের হার ৬৩.৬৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ ১৬১১৩ জন; কুমিল্লায় পাশের হার ৬৫.৪২ শতাংশ, জিপিএ-৫ ৯৮১৪ জন; যশোরে পাশের হার ৬৬.২৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ ১১৪৭৮ জন; চট্টগ্রামে পাশের হার ৫৯.৪৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ ৯৩৯৮ জন; বরিশালে পাশের হার ৬০.৩৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ ২৭৭৮ জন; সিলেটে পাশের হার ৫৮.৩৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ ৩৮৩৬ জন; দিনাজপুরে পাশের হার ৫৮.০৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ ১৩৬৩৯ জন এবং ময়মনসিংহে পাশের হার ৫৭.৩৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৭০০ জন। ঢাকা মহানগরীতে পাশের হার ৮৩.৪৪ শতাংশ এবং এখান থেকেই সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৮৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মাদ্রাসা বোর্ডে পাশের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন এবং কারিগরি বোর্ডে পাশের হার ৫৮.২০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।
ফলাফলের এই বিপর্যয়ের পেছনে শিখন ঘাটতি, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা এবং পরীক্ষায় কঠোর মনিটরিং ও খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়িকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। এবার মোট ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, করোনা পরবর্তী শিখন ঘাটতি এবং ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম ও দশম শ্রেণিতে পুরনো ধারায় ফিরে আসায় শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষাগত পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয়েছে। এছাড়া আইসিটি বিষয়ে পাশের হার প্রায় শতভাগ হলেও ইংরেজি ও গণিতে তা ৭০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। মানবিক বিভাগ থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন, অর্থাৎ ফেল করেছে ৫১.২৬ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৮ জনের মধ্যে পাশের হার ৮০.৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৯৬ জনের মধ্যে পাশ করেছে ১ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন বা ৬৪.২৯ শতাংশ।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফলে ভুল থাকলে বা প্রাপ্য নম্বর না পেলে আইনগতভাবে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি তাদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :