Facebook Twitter Instagram YouTube

জ্বালানি সংকটে থমকে আছে ৩৫ হাজার কোটির বিনিয়োগ


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ৪:০২ অপরাহ্ণ /
জ্বালানি সংকটে থমকে আছে ৩৫ হাজার কোটির বিনিয়োগ

দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চলমান জ্বালানি সংকট এখন আর কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, ব্যাংকঋণ ও সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, কম চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিক বিঘ্ন এবং চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কারণে দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি বর্তমান কর্মসংস্থানও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. সহিদুল হক মোল্লা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাই এখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই সংকট মোকাবিলায় কোনো খণ্ডিত বা সাময়িক পদক্ষেপ না নিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, এলএনজি, শিল্প, সার ও বিনিয়োগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাতে যে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার চিত্র উঠে এসেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাম্প্রতিক হিসাবে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সংকটের তীব্র সময়ে শিল্প খাতে দৈনিক উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এমনকি কারখানাগুলো যদি গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতা নিয়েও চলে, তাহলেও দৈনিক ক্ষতি ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সহিদুল হক মোল্লা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস হলো শিল্পের মূল চালিকাশক্তি। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিক নন, বরং শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ ব্যাহত হয়, সরকারের রাজস্ব কমে এবং পরিবহন, কাঁচামাল ও সেবা খাতের মতো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোও বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।

নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ স্থগিত রাখার কারণে বর্তমানে ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন আটকে আছে, যেখানে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সহিদুল হক মোল্লা এ প্রসঙ্গে বলেন, একজন উদ্যোক্তা জমি কেনা, ভবন নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আমদানি ও ব্যাংকঋণের মতো বড় বিনিয়োগের আগে নিশ্চিত হতে চান যে তার কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না। এই নিশ্চয়তার অভাবে অনেকেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। একদিকে সরকার নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান চাইছে, অন্যদিকে শিল্পের মৌলিক জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারছে না—এটি একটি বড় বৈপরীত্য। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, নতুন শিল্প গড়ে না উঠলে তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধানও এখন প্রকট। গত আগস্টে দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি), যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি। তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৪ হাজার এমএমসিএফডিরও বেশি। গত জুলাই মাসে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দৈনিক সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি কমে যায়। পরে টার্মিনালটি আংশিক চালু হলেও কয়েক দফায় সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে গিয়ে শিল্পে সরবরাহ কমাতে হয়েছে। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

জ্বালানি সংকট সামাল দিতে সরকারকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কাতারের সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কাতার ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, যার ফলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট ও বিকল্প উৎসগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত আগস্টে একটি এলএনজি কার্গো কিনতে প্রতি এমএমবিটিইউতে ২৩.৯৩ ডলার এবং অন্য একটি কার্গোর জন্য ২২.৩৫ ডলার পর্যন্ত দাম অনুমোদন করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনার মধ্যে আটটির ক্রয়প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সহিদুল হক মোল্লা বলেন, স্পট মার্কেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেটের ব্যবহার করতে হবে, তবে শুধু স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করা যাবে না।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এলএনজি কার্গো হরমুজের বাইরে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের মতো অস্বাভাবিক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এশিয়ার স্পট এলএনজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সহিদুল হক মোল্লা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে বাঁচতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। পুরোনো কূপের উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন।

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্প ও বিদ্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ইউরিয়া সার উৎপাদনেও বড় প্রভাব ফেলছে। দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়তি দামে সার আমদানি করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্য, সার ও জ্বালানির মূল্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকার জন্য বড় ঝুঁকি। সহিদুল হক মোল্লা বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের গ্যাস সংযোগের বিষয়ে স্পষ্ট নীতি দেওয়া। উদ্যোক্তারা যখন নিশ্চিত হবেন যে বিনিয়োগ করলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাবেন, তখনই তাদের আস্থা ফিরে আসবে, যা উৎপাদন, রপ্তানি, রাজস্ব ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin