Facebook Twitter Instagram YouTube

টাওয়ার ছাড়াই মোবাইল নেটওয়ার্ক: বাণিজ্যিক অনুমোদনের আবেদন বাংলালিংকের


প্রকাশের সময় : আগস্ট ২১, ২০২৬, ২:৩৪ অপরাহ্ণ /
টাওয়ার ছাড়াই মোবাইল নেটওয়ার্ক: বাণিজ্যিক অনুমোদনের আবেদন বাংলালিংকের

দেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, বিচ্ছিন্ন চর, দ্বীপ কিংবা গভীর সমুদ্রে থাকা মানুষকে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক। প্রথাগত মোবাইল টাওয়ার ছাড়াই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে যোগাযোগ স্থাপনের প্রযুক্তি ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডিটুসি) বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। বৈশ্বিক স্যাটেলাইট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এই সেবা চালুর অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে আবেদন করেছে তারা। অনুমোদন পেলে প্রাথমিকভাবে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে অপারেটরটির, যা পরবর্তীতে ভয়েস ও পূর্ণাঙ্গ ডেটা সেবায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা মূলত ভূমিতে স্থাপিত টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে মুঠোফোন অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তিতে সাধারণ ফোর-জি মুঠোফোনের সংকেত সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য কোনো বিশেষ স্যাটেলাইট ফোন বা অতিরিক্ত যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। কভারেজ এলাকার বাইরে গেলে প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী সাধারণ মুঠোফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে নেয়।

বর্তমানে দেশে মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটির কাছাকাছি এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। অপারেটরগুলোর নিজস্ব ২১ হাজার ৩৬৯টি টাওয়ারের পাশাপাশি আরও সাত হাজারের বেশি টাওয়ার ভাগাভাগি করে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে দেশের সব দুর্গম এলাকায় ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে টাওয়ার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। ফলে কম জনসংখ্যার বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপারেটরদের টাওয়ার স্থাপনে আগ্রহ কম থাকে। ডিটুসি প্রযুক্তি এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে একটি বড় সমাধান হতে পারে।

বাণিজ্যিক অনুমোদনের আগে চলতি বছরের এপ্রিলে স্টারলিংকের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য বিটিআরসির কাছে আবেদন করেছিল বাংলালিংক। মে মাসে সরকার দুই মাসের প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) পরীক্ষার অনুমতি দেয়। এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় বান্দরবান ও সন্দ্বীপের মতো নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা দুর্গম এলাকায় প্রযুক্তিটি সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়। বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে এর কার্যকারিতাও প্রদর্শন করে বাংলালিংক। সেখানে সাধারণ মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং ও ওটিটি ভয়েস কল সফলভাবে চালুর বিষয়টি প্রমাণিত হয়।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হওয়ার পর সম্প্রতি বাণিজ্যিকভাবে এই সেবা চালুর অনুমতি চেয়ে বিটিআরসিকে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলালিংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন সাধারণ টাওয়ার বা ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ডিটুসি বিকল্প ও জরুরি যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও সামুদ্রিক পেশাজীবীরা, যাঁরা স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের বাইরে থাকেন, তাঁরাও এর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের আওতায় আসতে পারবেন। এই সেবা চালুর ক্ষেত্রে কমিশনের সব নিয়ম ও শর্ত মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অপারেটরটি।

এ বিষয়ে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, ‘স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি দুর্গম ও প্রত্যಂತ এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে।’

তবে বাণিজ্যিক অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ন্ত্রক ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিটিআরসি যে অনুমতি দিয়েছিল, তা ছিল কেবল পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য এবং তা বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা দেয় না। এছাড়া আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) নিয়ম অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মোবাইল সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ড ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যা ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) নির্ধারিত হতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব এনজিএসও (নন-জিওস্টেশনারি অরবিট) স্যাটেলাইট সার্ভিসের গাইডলাইনেও এই লাইসেন্সের আওতায় স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক আইএমটি সেবা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অবশ্য বিটিআরসির একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এই প্রযুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রতিবেদন এখনো কমিশনের হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo