
কিশোরগঞ্জের দুর্গম হাওর জনপদ অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে তীব্র শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। এই তিন উপজেলার ২৪টি ইউনিয়নে বসবাসরত প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের শিশুদের শিক্ষার জন্য ২৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও প্রায় ৩০টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের ব্যাপক শূন্যপদে পাঠদান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে এই তিন উপজেলায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৪২৯ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। অধিকাংশ স্কুলে খেলার মাঠ ও বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, আর ওয়াশব্লক ও সুপেয় পানির অভাবে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসতে হয় এবং অনেক স্কুল দুই শিফটে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের ২৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ২৩০টি, যার মধ্যে ১৪৯টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে মাত্র ৮১ জন প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। সহকারী শিক্ষকের ১ হাজার ১৫১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৪৪ জন, অর্থাৎ ১০৭টি পদ সরাসরি শূন্য। এর ওপর প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদগুলোতে ১৪৯ জন সহকারী শিক্ষককে 'চলতি দায়িত্ব' ও 'অতিরিক্ত দায়িত্ব' পালন করতে হচ্ছে, যার ফলে সহকারী শিক্ষকের প্রকৃতপক্ষে ২৫৬টি পদ শূন্য থাকছে।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অষ্টগ্রামের ৮টি ইউনিয়নে ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০০। এখানে ৮৩টি প্রধান শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন, শূন্যপদ ৫৩টি। ৪১০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ১৯টি পদ শূন্য থাকলেও, ৫৩ জন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় বাস্তবে ৭২টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য। ইটনার ৯টি ইউনিয়নে ৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৬২৯ জন। এখানে ৭২টি প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত ২৬ জন, শূন্যপদ ৪৬টি। ৩৭২টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ২৮টি পদ শূন্য (দুটি সহকারী শিক্ষক পদে মামলা চলমান)। তবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় এখানে বাস্তবে ৭৪টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য। মিঠামইনের ৭টি ইউনিয়নে ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৫০০ জন। এখানে ৭৫টি প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত ২৫ জন, শূন্যপদ ৫০টি। ৩৫০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ৬০টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় এখানে বাস্তবে ১১০টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাজিদুর রহমানের অভিভাবক মাসুম মিয়া বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের মেধা বিকাশে শিক্ষক সংকট অন্যতম প্রধান বাধা। শূন্যপদে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং কর্মরত শিক্ষকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। মিঠামইন উপজেলার হাসিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, তার স্কুলে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও চারজন শিক্ষকের স্থলে আছেন মাত্র একজন। সম্প্রতি দুজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন এবং তাকে উপজেলা মাসিক সভায় থাকতে হয়। ইটনার ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুপ্রজিৎ দাস চৌধুরী জানান, তার স্কুলে ২২০ জন ছাত্রছাত্রী। ৬ জন শিক্ষকের স্থলে কর্মরত আছেন ৪ জন। তাকেও প্রায়ই উপজেলা অফিসে যেতে হয়, ফলে তিন শিক্ষকের পক্ষে নিয়মিত পাঠদান করানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
অষ্টগ্রাম উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিবিষয়ক মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে বহু বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। জুলাই মাসে সেই মামলার রায় হয়েছে এবং অচিরেই শূন্যপদ পূরণ হবে বলে আশা করছেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ স্বীকার করেন যে শিক্ষক সংকটে পাঠদান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স এলে অধিদপ্তর থেকে পদায়ন শুরু হবে এবং নিয়োগ ও বদলি সমন্বয়ের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ অনেকাংশেই কমে আসবে।
আপনার মতামত লিখুন :