
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার নদী ও সাগরে এখন রূপালি ইলিশের প্রাচুর্য থাকলেও উপকূলীয় জেলেদের ঘরে বিরাজ করছে চরম হতাশা ও দেনার বোঝা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে জেলেরা যে মাছ শিকার করছেন, তার সিংহভাগই চলে যাচ্ছে আড়তদার ও মহাজনদের দাদনের কিস্তি মেটাতে। ফলে ভরা মৌসুমে কোটি কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হলেও জেলেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
উপজেলার সামরাজ মৎস্যঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে ছেঁড়া জাল সেলাই করতে করতে নিজের দুঃখের কথা জানাচ্ছিলেন ৩২ বছর বয়সী জেলে আবদুল। চার দিন আগে পাঁচজন মাঝি-মাল্লা নিয়ে নদীতে গিয়ে ৬৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করলেও সেই টাকার প্রায় পুরোটাই চলে গেছে মহাজনের দাদনের কিস্তিতে। এমনকি পরবর্তী সময়ে চাল-ডাল কেনার জন্য তাকে আবার নতুন করে দেনা করতে হয়েছে। আবদুলের মতো একই ঘাটের রফিক মাঝি (৪২), ইদ্রিস (৩৭), আব্বাস উদ্দিন (২৩) ও রত্তন মাঝির (৪৪) কণ্ঠেও শোনা গেল একই আক্ষেপ। নদী-সাগরে ট্রলার নিয়ে গিয়ে ইলিশ পেলেও তা তাদের জীবনে কোনো আর্থিক স্বস্তি আনতে পারছে না। মেঘনা পাড়ের এক প্রবীণ জেলে আক্ষেপ করে বলেন, সাগরে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরলেও মহাজনদের দাদনের দাসত্ব থেকে তাদের মুক্তি মেলে না, কপালে চিরকাল দেনার খাতাই খোলা থাকে।
চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২৮১ এবং অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার। এছাড়া সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি। বিশাল এই মৎস্য অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও জেলেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। জাল কেনা, জ্বালানি সংগ্রহ, ট্রলার মেরামত কিংবা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়ে সংসার চালাতে জেলেরা বাধ্য হয়ে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নেন। আর এই দাদনের শর্ত হিসেবে আড়তদারদের নির্ধারিত কম দামে মাছ বিক্রি করতে হয় এবং বিক্রির সময় বড় অঙ্কের কমিশন কেটে নেওয়া হয়। ফলে এক খেপের মাছ বিক্রির পর জেলেদের হাতে সংসার চালানোর মতো টাকা থাকে না এবং পরবর্তী খেপে যেতে আবার ঋণ নিতে হয়। সামরাজ ঘাটের কাশেম মাঝি (৫৬) ও কবির মাঝি (৪৫) জানান, ট্রলারের খরচ, তেলের দাম ও আড়তদারের পাওনা পরিশোধের পর তাদের পকেটে কিছুই থাকে না।
জেলেদের এই অভিযোগের বিপরীতে সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপু ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি জানান, এই ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার জেলেদের পেছনে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় তেলের খরচ উঠলেও জেলেরা আড়তদারদের দাদন পরিশোধ করতে পারছেন না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মৎস্যজীবী অভিযোগ করেন, আড়তদারদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম নিচ্ছে এবং প্রশাসনিক নজরদারি এড়াতে জেলেদের দারিদ্র্য ও ঋণের বিষয়টি সামনে আনছে।
এদিকে স্থানীয় প্রধান প্রধান মৎস্যঘাট যেমন—সামরাজ, ঢালচর, কচ্ছপিয়া, বকসীরঘাট, ঘোষেরহাট, খেজুরগাছিয়া, মাইনউদ্দি ও নতুন স্লুইসগেট ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের বাজার বেশ চড়া। বাজারে দেড় কেজি ওজনের এক হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকায়, এক কেজি ওজনের হালি ৯ থেকে ১১ হাজার টাকা এবং ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি হালি ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন এসব ঘাটে কোটি কোটি টাকার মাছের লেনদেন হলেও তার সুফল জেলেরা পাচ্ছেন না। মাইনউদ্দি মৎস্যঘাটে মাছ কিনতে আসা ক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভরা মৌসুমেও মাঝারি সাইজের এক হালি ইলিশ সাত হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। আড়তদাররা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকানোর পাশাপাশি ইলিশে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মাছে ১৫ শতাংশ কমিশন কেটে রাখছেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে কেন কমিশন নেওয়া হবে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
উপকূলীয় এলাকার জেলেরা জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতা এবং সরকারি সহায়তার অপ্রতুলতার কারণে তারা মহাজনদের ফাঁদে পড়তে বাধ্য হন। তারা সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ও নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন। চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, বৃষ্টিপাতের কারণে নদীতে এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তবে বাজারে দাম বেশি। আড়তদারদের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলেদের দাদন দেওয়ার কারণে হয়তো আড়তদাররা কমিশন নেন, তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার বিষয়টি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে মৎস্যঘাটের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
আপনার মতামত লিখুন :