
দেশে প্রতিবছর গ্যাসের গড় উৎপাদন দিনে ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি হারে কমছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) ভিত্তিক এলএনজি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা থাকায় সরকার শিল্পে নতুন গ্যাস-সংযোগ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে ১৪ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এফএসআরইউ হলো ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট, যা আমদানি করা এলএনজি মজুত করে রূপান্তরের মাধ্যমে পাইপলাইনে সরবরাহ করে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এমন দুটি টার্মিনাল আছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হলেও একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এখন ৫০ কোটি ঘনফুটের কম সরবরাহ হচ্ছে, যার ফলে এক সপ্তাহ ধরে দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।
শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংযোগ না দেওয়ার বিষয়টি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে গ্যাস–সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একটি কমিটির মাধ্যমে তিতাস গ্যাসের ২৫টি সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা পরে বাতিল করা হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ মে সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে বৈঠক হলেও সংযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। ২০১৭ সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছিল, যা এরপর থেকেই কমতে শুরু করে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলে দিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা যায়, কিন্তু অবকাঠামোর অভাবে এটি বাড়ানোর সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, শিল্পে সংযোগ না দেওয়ার বিষয়টি সাময়িক। সরকার দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনা এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির মতো একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। যারা ইতিমধ্যে অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, তাদের অবশ্যই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছরে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয়। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও উৎপাদনে কয়েক বছর লাগতে পারে, আর আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত দেড় বছর সময়ের প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে এবং সার কারখানা বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। নতুন সংযোগ দিলেও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনার বিষয়ে আলোচনা চললেও আইএসও ট্যাংকের অবকাঠামো নির্মাণে এক বছর লাগবে এবং তা দিয়ে মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে, যা বড় শিল্পের চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, সরবরাহ বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, তবে যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের কথা ভাবতে হবে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করা ঠিক হয়নি। এছাড়া জিটিসিএল জানিয়েছে, মহেশখালী থেকে আসা দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারলেও, পরবর্তী সরু পাইপলাইনের কারণে ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তাই নতুন পাইপলাইন নির্মাণ অপরিহার্য।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের ১১ শতাংশ গৃহস্থালি, ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ, ৩৬ শতাংশ শিল্প, ৬ শতাংশ সার, ৫ শতাংশ সিএনজি এবং ১ শতাংশ চা খাতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে অনুমোদিত আবেদনগুলো থেকে আরও ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন, যা সংস্থান করা অসম্ভব। সরকার ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা এবং সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চেষ্টা করছে।
আপনার মতামত লিখুন :