
একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মানুষ যত বেশি সুস্থ থাকবে, তাদের উৎপাদনশীলতা তত বাড়বে এবং পরিবারের চিকিৎসার পেছনে অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাস পাবে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা সরাসরি শ্রমঘণ্টা নষ্ট করে এবং পারিবারিক সঞ্চয় কমিয়ে দেয়। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে কেবল ব্যয় হিসেবে না দেখে, একে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে দেখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের নতুন ধাপে প্রবেশ করতে চায়, তবে স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ। পূর্ববর্তী অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ।
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা Public-Private Partnership (PPP) অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। এই অংশীদারিত্বে (partnership) সরকারি (public) ও বেসরকারি (private) খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। এখানে সরকারের ভূমিকা হবে নীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ, মান নিশ্চিতকরণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রণোদনা প্রদান এবং সবার জন্য সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাত তার বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং সেবা প্রদানের সক্ষমতা নিয়ে অংশগ্রহণ করবে। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে উভয় খাতের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, একজন সুস্থ কৃষক, পোশাকশ্রমিক, উদ্যোক্তা বা চাকরিজীবীর কর্মক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হলে সামগ্রিক উৎপাদন কমে যায় এবং আয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসায় চলে গেলে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা সহজ করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে রোগীদের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থা চালু হলে রোগীকে বারবার একই পরীক্ষা করতে হবে না এবং চিকিৎসকেরা দ্রুত রোগীর পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস জানতে পারবেন। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় কমানো সম্ভব হলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়েরই বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল রোগীর চিকিৎসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অবহেলা করা হবে। স্বাস্থ্য খাত একই সঙ্গে একটি সামাজিক সেবা এবং বড় অর্থনৈতিক খাত। হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসা, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যাওয়া অর্থ দেশেই ধরে রাখা যাবে। তিনি ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো জটিল চিকিৎসার সুযোগ জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে বেসরকারি বিনিয়োগে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
সাকিফ শামীম স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি (PPP) মডেলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না; কোন এলাকায় কত শয্যার হাসপাতাল প্রয়োজন, কী ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও নার্স-চিকিৎসক লাগবে, তার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প নিতে হবে। এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি। পিপিপি মডেলের আওতায় সরকার জমি ও নীতিগত সহায়তা দিতে পারে এবং বেসরকারি খাত বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে পারে। চিকিৎসাসেবা মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি ভর্তুকি, বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড বা ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. রুমানা হক মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক হলেও বরাদ্দের অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা এবং কাঠামোগত সংস্কার করা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগকে দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে পরবর্তী পর্যায়ের জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপ অনেকটাই কমে যাবে। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন, যার প্রথম শর্তই হলো সুস্থতা।
ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা artificial intelligence, telemedicine, digital health records, remote diagnostics এবং data-driven healthcare ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সব ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সবসময় উপস্থিত রাখা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু টেলিমেডিসিনের (telemedicine) মাধ্যমে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসককে রাজধানীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। একইভাবে আধুনিক diagnostic technology ব্যবহার করে দূরবর্তী এলাকা থেকেও রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়। সরকার প্রয়োজনীয় digital health infrastructure ও regulatory framework তৈরি করতে পারে। বেসরকারি খাত সেখানে প্রযুক্তি (technology), বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন নিয়ে আসতে পারে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি সময় ও খরচও কমানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানবসম্পদ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একজন সুস্থ মানুষ বেশি সময় কর্মক্ষম থাকেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমে।
আপনার মতামত লিখুন :