Facebook Twitter Instagram YouTube

চড়া দামে এলএনজি আমদানি: পেট্রোবাংলায় তীব্র অর্থসংকট, ১,৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকির সুপারিশ


প্রকাশের সময় : জুলাই ৩১, ২০২৬, ১২:৩৮ অপরাহ্ণ /
চড়া দামে এলএনজি আমদানি: পেট্রোবাংলায় তীব্র অর্থসংকট, ১,৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকির সুপারিশ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা গভীর সংকটে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছে পেট্রোবাংলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার স্বার্থে পেট্রোবাংলার অনুকূলে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই অর্থ চলতি জুলাই মাসের শেষ ১৫ দিনের প্রাক্কলিত ঘাটতি মেটাতে জরুরিভাবে প্রয়োজন। অর্থ বিভাগের নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সময়মতো এই বিল পরিশোধ করতে না পারলে বিদেশি এলএনজি সরবরাহকারীরা ভবিষ্যতে কার্গো পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।

এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে গ্যাস সরবরাহে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে লক্ষ্যে এলএনজি আমদানির অর্থায়ন দ্রুত নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প সরবরাহ উৎস অনুসন্ধানের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই সরকারের অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তুলনামূলক কম দামে এলএনজি পাওয়া গেলেও এখন বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নতুন ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে, যা অব্যাহত থাকলে মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগের বিশেষ সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ে সরবরাহকৃত এলএনজির বিপরীতে পেট্রোবাংলার প্রাক্কলিত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাতে আগে থেকেই অনুমোদিত ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে এই বিশাল ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এর আগে মে ও জুন মাসে নির্ধারিত কার্গোর বাইরে অতিরিক্ত পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়েছিল। এরপর ১ থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আরও পাঁচটি কার্গো দেশে এসেছে। সময়মতো এসব বিল পরিশোধ করা না গেলে বিদেশি সরবরাহকারীরা ভবিষ্যতে নতুন কার্গো পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা হলেও রাজস্ব আদায় আশানুরূপ হয়নি। বিক্রয় কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজস্ব ঘাটতির কারণে জুলাইয়ের প্রথমার্ধেই প্রায় ১৯০ কোটি টাকা কম আয় হয়েছে। ফলে ওই সময়ের পাঁচটি এলএনজি কার্গোর বিপরীতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায়। জ্বালানি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি এলএনজি কার্গো আমদানিতে যেখানে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতো, এখন স্পট মার্কেট থেকে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে ৬৫০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকা বা তারও বেশি খরচ হচ্ছে। সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে সরবরাহকারীরা নতুন কার্গো পাঠানো বন্ধ করে দিলে দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সংকট তীব্র রূপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে স্বল্পমেয়াদে সরকারকে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতেই হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কেবল ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদার, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারের পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লস কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার তাগিদ দেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই বাজেটের ওপর চাপ কমাতে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করে আসছে, যা তাদের ঋণ সহায়তার অন্যতম শর্ত।

কথা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত কিছু কাজ করতে চায়। এলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজার পরিস্থিতি এরকম থাকলে চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই অতিরিক্ত ১৫-২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor