
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আধুনিক ও সহজ করে তুলছে। তবে কয়েক শতাব্দী আগে একটি যান্ত্রিক আবিষ্কার বিশ্ব প্রযুক্তির ইতিহাসে চরম যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল, যা মানব সমাজকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। মানুষের স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করা, শিক্ষাকে সর্বজনীন করা এবং বৃহৎ পরিসরে যোগাযোগ সৃষ্টির সেই ঐতিহাসিক মাধ্যমটি হলো মুদ্রণযন্ত্র। প্রতি বছর ১৪ আগস্ট এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবনের কথা স্মরণ করা হয়, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল প্রায় ছয় শতক আগে ১৪৩৭ সালে।
প্রাচীনকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুদ্রণের ভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে মাটির ফলকে লেখা দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করতে নলাকার সিলমোহর ব্যবহার করা হতো। এছাড়া মৃৎপাত্রে ছাপ, কাপড়ে নকশা ও মুদ্রা তৈরি ছিল মুদ্রণের শুরুর রূপ। পরবর্তীকালে সপ্তম শতাব্দীতে চীনে কাঠের ব্লকে (উডব্লক প্রিন্টিং) রেশম ও কাগজে মুদ্রণ শুরু হয়, যা পরে এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে জার্মান উদ্ভাবক জোহানেস গুটেনবার্গ প্রচলিত কৌশলের আধুনিকায়ন ঘটিয়ে প্রথম মেটাল টাইপ বা আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র তৈরি করেন। গুটেনবার্গের এই প্রযুক্তির কল্যাণে কম খরচে ও দ্রুত বই ছাপা সম্ভব হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাইবেল ব্যাপক পরিসরে মুদ্রিত হয়, যা আজও বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত ও মুদ্রিত বইয়ের স্থান ধরে রেখেছে। এই বইটির প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখের বেশি কপি মুদ্রিত হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষা ও জ্ঞানের অধিকার কেবল উচ্চবিত্তের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসে, যা রেনেসাঁ যুগ থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বৈপ্লবিক সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে লেখকদের বই হাত দিয়ে নকল বা অনুলিপি করতে হতো, যাতে ভুলের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত বেশি। মুদ্রণপ্রযুক্তি এই ভুল শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে লিখিত তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। এর মাধ্যমে লেখক ও গবেষকরা তাদের চিন্তা ও আবিষ্কার স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ পান। মেধা ও সৃজনশীলতা রক্ষায় এই সময়ই আত্মপ্রকাশ ঘটে কপিরাইট, সাহিত্য চৌর্য প্রতিরোধ ও মেধাস্বত্ব আইনের, যা আজও কার্যকর রয়েছে।
১৬২০ সালে ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন মুদ্রণযন্ত্রকে পৃথিবী পরিবর্তনকারী অন্যতম আবিষ্কার হিসেবে আখ্যা দেন। ১৪৫০ সালের দিকে গুটেনবার্গ ধাতব অক্ষরের ব্যবহার শুরু করলে পৃথিবী ও মানবদেহের অঙ্গসংস্থানের মানচিত্র নিখুঁতভাবে ছাপা সম্ভব হয়। এই নির্ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস মহাবিশ্ব ও সৌরজগতের বৈজ্ঞানিক মডেল উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীকালে শিল্পবিপ্লবের যুগে বাষ্পচালিত যান্ত্রিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হলে প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার পৃষ্ঠা ছাপা শুরু হয়, যা দ্রুততম সময়ে সংবাদপত্র প্রকাশ ও তথ্য আদান-প্রদানে বিপ্লব ঘটায়। এটিই বর্তমান যুগের থ্রিডি (3D) প্রিন্টিং প্রযুক্তির মূল ভিত্তি।
বই সহজলভ্য হওয়ার পর বড় বড় শহরগুলো জ্ঞান ও ব্যবসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। গ্রামীণ কৃষকরা নিখুঁত কৃষিপঞ্জিকা দেখে কৃষিকাজে গতি আনেন। পাশাপাশি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিপ্লবেও এটি বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মসংস্কার আন্দোলন, ইউরোপীয় আলোকায়ন (Enlightenment) এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিপ্লবের সময় মুদ্রিত প্রচারপত্র ও বই সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখে। সাধারণ মানুষের মনে সমালোচনামূলক চিন্তা ও গণতান্ত্রিক আলোচনার পথ সুগম করার ক্ষেত্রে মুদ্রণযন্ত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আপনার মতামত লিখুন :