
প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না প্রত্যাশা অনুযায়ী। যেটুকু কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তার জন্য উপযোগী দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বিদেশের শ্রমবাজারেও বিপুলসংখ্যক অদক্ষ কর্মী যাওয়ায় তারা কাঙ্ক্ষিত বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দেশে বর্তমান বেকারদের ৭৬ শতাংশই তরুণ, আর উচ্চশিক্ষিতদের একটি বড় অংশকে চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী, যার সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর একজন বেকার। বিবিএস-এর তথ্যমতে, ২৭ শতাংশের বেশি বেকার যুবককে চাকরির জন্য এক থেকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয় এবং ৮ শতাংশকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ খুঁজতে হয়। উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে এই অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ; প্রায় প্রতি তিনজনের একজনকে এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে ৫০ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীর প্রোফাইল রয়েছে, যা দুই বছর আগের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী এই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছেন। বর্তমানে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি আবেদন করছেন, যেখানে কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী মনে করেন, শুধু ঋণ সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়; নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং বিদ্যমান পদগুলোতে নিয়োগ কম হওয়ায় বেকারত্ব ও প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ছে।
বিদেশের শ্রমবাজারের চিত্রও একই। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২২ শতাংশ দক্ষ। বাকি ৭৪ শতাংশই স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ। ২০২৪ সালে দক্ষ কর্মীর হার ছিল ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং পেশাজীবী ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়ে উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তা টেকসই কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চার জেলায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ১৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেওয়া ২ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৮২ শতাংশ বা ৭২ জন এ পেশায় যুক্ত হতে পেরেছেন। কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৬৪০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ বা ১২১ জন চাকরি পেয়েছেন। আইএমইডির মতে, এই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মূল দুর্বলতা পরবর্তী ধাপের অভাব। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য ঋণ সুবিধা, কর্মসংস্থানের লিংকেজ এবং নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ না থাকলে এসব প্রশিক্ষণ কেবল সার্টিফিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
আপনার মতামত লিখুন :