Facebook Twitter Instagram YouTube

মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৪, ২০২৬, ৯:২১ পূর্বাহ্ণ /
মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এই হামলার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পাঁচ মাস পরও মার্কিন বাহিনীতে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটানোর সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেল। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর, এই প্রথম ইরানের কোনো হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সেনার মৃত্যু হলো। গত শুক্রবার এই ঘটনাটি ঘটে। পেন্টাগন এখনো হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও, বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি ওয়াশিংটনের জন্য এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বিমান হামলার পরও ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। এসব সেনা মূলত এমন কিছু স্থায়ী ঘাঁটিতে কাজ করছেন, যা ইরানের দিন দিন শক্তিশালী হতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের একদম নাগালের মধ্যে এবং বেশ অরক্ষিত। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী এবং তারা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। কাভানাফের ধারণা, সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় ইরানের হামলাগুলো সময়ের সঙ্গে আরও নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী ইরানের যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার বিষয়টি সত্য নয়; তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও নতুন শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের অনেকেই আধা-স্থায়ী ব্যারাকে অবস্থান করছেন। এগুলো মূলত রকেট, মর্টার বা দেশীয় প্রযুক্তির বোমার (আইইডি) আঘাত সামলানোর উপযোগী করে তৈরি, ফলে ভারী যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এগুলোর নেই। ক্রিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ঘাঁটিতে আঘাত না হানলেও এর তীব্র বিস্ফোরণের চাপে (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনারা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে পড়ছেন। আবার মাঝ আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও সেটির ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও সেনারা আহত হচ্ছেন।

চলমান এ যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অফিশিয়ালি নিহত সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার ও সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত মার্কিন সেনা নিহত হন। এছাড়া মার্চে জ্বালানি নেওয়ার সময় এক বিমান দুর্ঘটনায় ছয় বৈমানিক এবং ইরাকে ভূপাতিত করা একটি সশস্ত্র ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে এক মার্কিন সার্জেন্ট প্রাণ হারান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। ৮ জুলাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও ভবনসহ প্রায় ২২০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

ইরান তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বোকা বানাচ্ছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, মার্কিন বাহিনীর ‘প্যাট্রিয়ট’ সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান এমন কিছু ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করেছে, যা ভিন্ন ভিন্ন গতি ও পথে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে নকল লক্ষ্যবস্তু ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্র ব্যবহার করায় মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। ক্রিগ বলেন, ধেয়ে আসা অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে সামান্য কয়েকটি অস্ত্র ভেতরে ঢুকে পড়লেই তা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার ক্ষেত্রে ইরান অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ইরানের নিখুঁত নিশানা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়া অথবা বিপুল সংখ্যায় হামলার কারণে দু-একটি আঘাত সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান টানা ১২ দিন ধরে একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র ও হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময় বাহরাইনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন মাঝপথেই আটকে দিয়েছে।

অন্যদিকে, উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত মঙ্গলবার বলেছে, মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের সামরিক অপারেশন সেন্টার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমানের হ্যাঙ্গার, ড্রোন মজুত রাখার কেন্দ্র ও সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলাগুলো পরিচালনা করেছে। এদিকে, যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সামরিক বাহিনী ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। গতকাল সিনেটররা এ নিয়ে তাকে তীব্র জবাবদিহির মুখে ফেলেন। সিনেটর জন অসফ সরাসরি প্রশ্ন করেন, যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে তার করা সেই দাবি সঠিক ছিল কি না। হেগসেথ অবশ্য নিজের অবস্থানে অনড় থেকে একে একটি ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দেন, তবে স্বীকার করেন যে ইরান যে একদমই হামলা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, তা তারা আশা করেননি।

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, মার্কিন হামলা সত্ত্বেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে এবং এমন কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যা আগে কখনো করেনি। ক্যাম্পবেলের মতে, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়টি হয় বাড়িয়ে বলেছে, নয়তো তাদের শক্তির এমন কিছু দিকের ওপর নজর দিয়েছে যা মূল কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ব্যুরির মতে, ওয়াশিংটনের বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইরান মার্কিন সেনা ও স্থাপনার ওপর প্রাণঘাতী আঘাত অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে। ব্যুরি আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে আসল সমস্যা হলো ব্যয়ের চরম অসংগতি; ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং উৎক্ষেপণের খরচ, সেগুলো মাঝ আকাশে ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের খরচের চেয়ে অনেক গুণ কম। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার কোনো প্রয়োজন ইরানের নেই; মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির উপস্থিতির ওপর মানবিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে মাঝেমধ্যে কয়েকটি নিখুঁত আঘাত হানতে পারাটাই ইরানের জন্য যথেষ্ট।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo