
কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো ফাঁকা বুলি বা সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে একটি ‘অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়তে পারে উল্লেখ করে মার্কিন নাগরিকদের সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন তিনি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান এই সংঘাত অবসানে শান্তি আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন। তিনি লিখেছেন, এই প্রণালি মূলত ইরানের নির্দেশেই খোলা কিংবা বন্ধ হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নিয়ে অলীক কল্পনায় বিভোর থাকবে, ততক্ষণ ইরান এই অবরোধ বলবৎ রাখবে। কাজেম গরিবাবাদি আরও জোর দিয়ে বলেন, কোনো টুইট, বিমানবাহী রণতরি, বিশেষ আদেশ জারি কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতা দিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে দেশটির অনীহার কথা জানিয়েছেন। ইরানের সংবাদমাধ্যম শাহরারা নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে পুনরায় স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মেনে নিতে হবে। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো, যা এখন পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতের জেরে মার্কিন নাগরিকদের পেট্রোলের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের মানসিক প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, একটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট দেশ যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেজন্য পেট্রোলের পেছনে সামান্য বেশি দাম দেওয়া অত্যন্ত সার্থক। মূলত এই যুক্তি দেখিয়েই ট্রাম্প ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) দেওয়া তথ্য অনুসারে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। অথচ নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকদের পেট্রোলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। পেট্রোলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র হয়েছে এবং সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়তে পারে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই ইরান যুদ্ধের এই নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবকে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের ময়দানে ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ইরান নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এই সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে এই পরিস্থিতির জন্য তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞাকেই প্রধানত দায়ী করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :