
বাংলাদেশের ঘরোয়া অ্যাথলেটিক্সে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন। লিঙ্গ নির্ধারণী পরীক্ষায় নারী হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের দুই খ্যাতনামা অ্যাথলেট জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে নারী বিভাগে খেলার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে তাদের অর্জিত সমস্ত পদক ও জাতীয় রেকর্ড। আজ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সভায় এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফেডারেশনের আওতাধীন রেজিস্টার্ড এই দুই অ্যাথলেটের লিঙ্গ নিয়ে স্ব-স্ব সংস্থা আপত্তি তোলার পর বিষয়টি মেডিকেল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জান্নাত বেগম ও বাংলাদেশ navy-র কবিতা রায়ের শারীরিক পরীক্ষার জন্য ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ পরীক্ষা-পরীক্ষা শেষে ২০২৬ সালের ১১ মে কার্যক্রম সম্পন্ন করে গত ১৬ মে ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করে এই মেডিকেল বোর্ড।
মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম এবং ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায়ের হরমোন ও শারীরিক পরীক্ষায় '৪৬, এক্সওয়াই ডিএসডি' (Differences of Sex Development) ধরা পড়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী তাদের পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উভয় অ্যাথলেটেরই 'পেনোস্ক্রোটাল হাইপোস্পেডিয়াস' (Penoscrotal Hypospadias) রয়েছে এবং তাদের উভয় জননগ্রন্থি (গোনাড) ইনগুইনাল ক্যানেলে অবস্থিত।
এছাড়া পরীক্ষায় তাদের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্সের নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, নারী বিভাগে অংশ নিতে হলে একজন অ্যাথলেটের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা টানা ২৪ মাস ধরে ২.৫ ন্যানোমোল/লিটার (nmol/L)-এর নিচে থাকা বাধ্যতামূলক। তবে জান্নাত বেগমের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া গেছে ১৯.৬৬ nmol/L, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে কবিতা রায়ের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ছিল ১৬.৫০ nmol/L, যা সীমার চেয়ে সাড়ে ৬ গুণেরও বেশি। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের নারী বিভাগে খেলার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দুই অ্যাথলেটের আগের সব সাফল্য বাতিল করা হয়েছে। জান্নাত বেগমের জ্যাভলিন থ্রো ও ডিসকাস থ্রো ইভেন্টে গড়া দুটি নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ ৮টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদক কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর কবিতা রায়ের ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার ইভেন্টে অর্জিত ১টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদক বাতিল করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই ইভেন্টগুলোর পদক তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে থাকা অ্যাথলেটদের মাঝে পুনঃবণ্টন করা হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এমন ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটলেও বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন জানিয়েছে, বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের সঠিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই তারা এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আপনার মতামত লিখুন :