
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এই জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, ২০১১ সালে র্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই তিনি তিনটি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২৬তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত সাজ্জাদুল ইসলাম ২০১১ সালের ৫ জুলাই র্যাব সদর দপ্তরে যোগ দেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১১ জুলাই তাকে র্যাব-৩ এ পদায়ন করা হয়। যোগদানের দিনই তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম তাকে জানান যে, জিয়াউল আহসানের নির্দেশে রাতে একটি বিশেষ অভিযানে অংশ নিতে হবে।
সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, ওইদিন রাত ১১টার দিকে বেশ কয়েকটি গাড়িতে করে তারা র্যাব সদর দপ্তর থেকে গাজীপুর-জয়দেবপুর এলাকার দিকে রওনা হন। একটি সেতুর ওপর পৌঁছানোর পর চোখ ও হাত বাঁধা এক ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তির মাথার পেছনে গুলি করেন এবং মরদেহটি সেতুর নিচে ফেলে দেন।
পরবর্তীতে আরেকটি স্থানে তাকে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এ অংশ নিতে বলা হয়। সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, অভিযানের প্রকৃতি জানতে চাইলে জিয়াউল আহসান তাকে ইংরেজিতে গালিগালাজ করেন এবং গাড়িতে বসে থাকতে নির্দেশ দেন। তিনি কাজটি অবৈধ উল্লেখ করে তাতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হুমকি দেয়া হয়। ভয়ে গাড়ির ভেতরে দোয়া-দরুদ পড়ার সময় তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান এবং পরে আরেক ব্যক্তিকে চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যেতে দেখেন, যিনি আর ফিরে আসেননি। তার ধারণা অনুযায়ী, ওই পুরো অভিযানে অন্তত তিনজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে।
অভিযান শেষে গভীর রাতে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ রোডে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরের দিন র্যাব-৩ এ যাওয়ার পথে তিনি জানতে পারেন যে, তাকে র্যাব থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং সরাসরি কুমিল্লা সেনানিবাসের অর্ডন্যান্স ডিপোতে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেনা সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার সুযোগও তাকে দেয়া হয়নি।
তিনি জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার তিন থেকে চার দিন পর জাতীয় দৈনিকে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় তিনটি মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, ওই রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছিল। র্যাবের ওই ঘটনার পর সেনাবাহিনীতে তাকে ‘অবাধ্য’ ও ‘অবিশ্বস্ত’ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যার ফলে কর্মদক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি পদোন্নতি পাননি। শেষ পর্যন্ত চাকরির ১২ বছর বাকি থাকতেই ২০১৩ সালে তিনি মেজর পদে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
আপনার মতামত লিখুন :