
সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালে দুই দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে তিনি তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তিনি ১৯৮১ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করা শেখ হাসিনা ছাত্রজীবন থেকেই গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি, কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সে সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি ছয় বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন এবং ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনটি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী শেখ হাসিনা ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনে পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠিত করেন। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৬ জুলাই কারাবন্দী হন শেখ হাসিনা এবং মুক্তি পান ১১ জুন। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বর মাসে দুবার গৃহবন্দী, ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ প্রায় তিন মাস গৃহবন্দী, ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর ১৫ দিন গৃহবন্দী, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস অন্তরীণ, ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হয়ে গৃহবন্দী এবং ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ ছিলেন তিনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে জনসভায় তাঁকে হত্যার উদ্দেশে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়। ওই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ ২২ নেতা-কর্মী নিহত হন এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হন; শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান।
শান্তি, গণতন্ত্র ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ইউনেসকোর ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কার, ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কার, ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভার্সিটি পুরস্কার, দুবার সাউথ সাউথ পুরস্কার, ইউনেসকোর ‘শান্তির বৃক্ষ’, উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরামের রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার, গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কার, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননা সনদ, জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচির ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫’ এবং আইটিইউ-এর ‘আইসিটিএস ইন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৫’ পেয়েছেন। তিনি ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘ওরা টোকাই কেন?’, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, ‘দারিদ্র্য বিমোচন, কিছু ভাবনা’, ‘আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম’, ‘আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘সাদা কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, ‘Miles to Go, The Quest for Vision-2021’সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা।
প্রযুক্তি, রান্না, সংগীত ও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে ইন্তেকাল করেন। তাঁদের এক ছেলে তথ্য প্রযুক্তিবিদ সজীব আহমেদ ওয়াজেদ এবং এক মেয়ে মনোবিজ্ঞানী সায়মা হোসেন ওয়াজেদ রয়েছেন। শেখ হাসিনার নাতি-নাতনির সংখ্যা সাত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদীর্ঘ ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেসকো তাঁকে ‘হুপে-বোয়ানি’ (Houphouet-Boigny) শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে।
এ ছাড়া টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award-2015 প্রদান করে।
আপনার মতামত লিখুন :