
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সময়ের পরিক্রমায় এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে শুরু হলেও তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন ও বলপ্রয়োগের কারণে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের মতো চট্টগ্রামও এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ৩৬ দিনের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি পায়।
আন্দোলনের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ, ওমরগনি এমইএস কলেজ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে সরব ছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও মামলা শুরু হয়। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর মোড়ে পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলায় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ওমরগনি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সল আহমেদ শান্ত এবং পথচারী মো. ফারুক নিহত হন। শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার এই ঘটনা চট্টগ্রামকে প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ তখন আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জন-প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
১৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও আন্দোলনের গতি কমেনি। ১৮ জুলাই 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচির সময় বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, জিইসি ও মুরাদপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়াসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদয় চন্দ্র তরুয়াসহ আরও অনেকের মৃত্যু হয়। ১৯ জুলাই থেকে কারফিউ জারি এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পরেও শিক্ষার্থীরা টিকটক, ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন।
জুলাইয়ের শেষভাগে চট্টগ্রামে ব্যাপক 'ব্লক রেইড' ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। তবে এসব দমনে শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানান। আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের গতি নতুন মাত্রা পায়। ২ আগস্ট আন্দরকিল্লা থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিশাল গণমিছিল বের করে। ৩ আগস্ট নিউ মার্কেটে স্মরণকালের অন্যতম বড় সমাবেশে সরকারের পদত্যাগের 'এক দফা' দাবি ঘোষণা করা হয়। ৪ আগস্ট আবারও সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হন।
অবশেষে ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির দিনে চট্টগ্রাম জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো শহরে বিজয়ের উল্লাস শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৩ জন শহীদ হন এবং ১ হাজার ৭৩৮ জনের বেশি মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে মুহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ফয়সল আহমেদ শান্ত, হৃদয় চন্দ্র তরুয়াসহ অন্যদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :