
তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্পটি দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা থেকে বের করে এনে সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান, প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে। প্রকল্পের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্রান্ট কর্মসূচির আওতায় ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নারী উদ্যোক্তারাও রয়েছেন। এর ফলে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে এবং তাদের গড় রপ্তানির পরিমাণ ১৯২ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন এসেছে, যা সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে এবং রপ্তানিকারকের হার ৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্পায়নের ভিত্তি মজবুত করতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি) এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)-এর জন্য জমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছে, যার ৩৮ শতাংশই নারী। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় তিন গুণ। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পকে সরকার ও বেসরকারি খাতের সফল অংশীদারত্বের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছে। প্রকল্পের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ উপকারভোগী নির্বাচন ও অগ্রগতি যাচাইয়ের কাজ করেছে, যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সহায়তা করেছে।
আপনার মতামত লিখুন :