Facebook Twitter Instagram YouTube

সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি


প্রকাশের সময় : জুলাই ৩০, ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ /
সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের থালায় এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। রান্নার সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে চিনি এবং শিশুদের জন্য কেনা দুধ—সবখানেই মিলেছে এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। দেশের তিনটি পৃথক গবেষণায় এই দূষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছেন গবেষকরা। তাদের মতে, প্রতিদিন অজান্তেই হাজারো প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালিত এই পরীক্ষায় প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত কণা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহণ এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ থেকেই এসব কণা চিনিতে মিশেছে।

অন্যদিকে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিটির মধ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন। গবেষণায় প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। দুধ সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপেই এসব কণা খাদ্যে যুক্ত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা রয়েছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারে প্রকাশিত এই গবেষণায় তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায় সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, প্লাস্টিকের পাত্রের পুনর্ব্যবহার এবং খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রির অনিয়ম এর অন্যতম কারণ।

তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ফাইবারজাতীয় কণা, যা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকের যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, পাইপ বা বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যে মিশতে পারে। গবেষণার তথ্যমতে, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা ঢুকছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তা খাদ্যমান তদারকি সংস্থার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই বাজারে এসেছে। মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার গাফিলতি আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি এসব পণ্য পুনরায় পরীক্ষা করা এবং সমস্যা পেলে তা বাজার থেকে তুলে নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ সতর্ক করে বলেন, অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া এটি অন্ত্রের প্রদাহ, হজমের সমস্যা, উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করা এবং হরমোনের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি এসব কণা মস্তিষ্কে পৌঁছে স্নায়বিক রোগের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor