
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন ঘোষণা হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ—উভয়ের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে এবং এখন মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। এর আগে ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানান।
মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিরোধের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আসামিদের ভূমিকা ছিল, যা দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি করেছে এবং এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।
মামলার সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক। ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাকের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম দফায় ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়, পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুলাই সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের অতিরিক্ত জবানবন্দি নেওয়া হয় এবং ২ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তার পুনরায় জেরা ও সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য পর্ব চূড়ান্তভাবে শেষ হয়।
পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা আইনি লড়াই পরিচালনা করেছেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তার মক্কেলরা কোনো ‘কমান্ডিং পজিশনে’ ছিলেন না বা কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি। অন্যদিকে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনের ঘটনায় তার মক্কেলদের নাম আসেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত চলা বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না এবং মামলায় কোনো নারী সাক্ষী নেই বা ভিডিও ফুটেজে আসামিদের হাতে লাঠিসোঁটা থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি চার আসামির খালাসের আবেদন জানান।
আপনার মতামত লিখুন :