
বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে সব রাষ্ট্রপ্রধান তাদের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, গণবিক্ষোভ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামরিক চাপ কিংবা অভিশংসনের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়ে অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকেই মেয়াদের আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে।
এই দীর্ঘ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন নির্বাচিত সরকার গঠনের পর ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বিশ্বজুড়ে মেয়াদের আগে পদত্যাগ বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের তালিকায় প্রথমেই আসে ফ্রান্সের শার্ল দ্য গোল (১৯৬৯)-এর নাম, যিনি প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর আয়োজিত গণভোটে হেরে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে অভিশংসন এড়াতে দেশটির ইতিহাসের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন।
১৯৮৬ সালে ফিলিপাইনের ফের্দিনান্দ মার্কোস ব্যাপক দুর্নীতি ও নির্বাচনি কারচুপির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আর্জেন্টিনার রাউল আলফনসিন (১৯৮৯) চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সৃষ্ট গণবিক্ষোভের মুখে মেয়াদের ৬ মাস আগেই পদত্যাগ করেন।
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের ফের্নান্দো কলর ডি মেলো দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলে সিনেটের চূড়ান্ত ভোটের আগেই পদত্যাগ করেন। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো (১৯৯৮) এশীয় অর্থনৈতিক মন্দা এবং দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ৩২ বছরের শাসনের ইতি টেনে পদত্যাগ করেন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাশিয়ার বরিস ইয়েলৎসিন আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন এবং ভ্লাদিমির পুতিনকে উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেন।
বলিভিয়ার গনজালো সানচেজ ডি লোজাডা (২০০৩) অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। হাইতির জাঁ-বারট্রান্ড অ্যারিস্টিড (২০০৪) সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফ (২০০৮) অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় এবং তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করেন।
মিশরের হোসনি মুবারক (২০১১) ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্ত’ গণআন্দোলনের মুখে সুদীর্ঘ ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইয়েমেনের আলি আবদুল্লাহ সালেহ (২০১২) একই আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
ব্রাজিলের দিলমা রুসেফ (২০১৬) বাজেট আইন লঙ্ঘনের দায়ে সিনেটের ভোটে অভিশংসিত হয়ে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারিত হন। দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক গিউন-হাই (২০১৭) ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে পার্লামেন্টে অভিশংসিত হওয়ার পর আদালত কর্তৃক বরখাস্ত হন।
জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে (২০১৭) দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সামরিক হস্তক্ষেপ ও নিজ দলের চাপে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন। ২০১৮ সালে পেরুর পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পদত্যাগ করেন।
একই বছর দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাকব জুমা দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ এবং নিজ দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের জোসেফ কাবিলা (২০১৮) দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কাজাখস্তানের নুরসুলতান নজরবায়েভ (২০১৯) প্রায় তিন দশক দেশ শাসনের পর সাধারণ অসন্তোষ ও বিক্ষোভের মুখে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন।
ইভো মোরালেস (২০১৯) বলিভিয়ায় নির্বাচনি কারচুপির অভিযোগ এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০২০ সালে পেরুর মার্টিন ভিজকারা কংগ্রেসের মুখোমুখি হয়ে অভিশংসনের মাধ্যমে পদচ্যুত ও অপসারিত হন। এছাড়া ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার গোটাবায়া রাজাপাকসে ইতিহাসসেরা অর্থনৈতিক সংকটের জেরে সৃষ্ট তীব্র গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং অনলাইনে পদত্যাগপত্র পাঠান।
ভিয়েতনামের নগুয়েন জুয়ান ফুক (২০২৩) এবং ভো ভান থুওং (২০২৪) উভয়ই কমিউনিস্ট শাসিত দেশটির দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মুখে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আপনার মতামত লিখুন :