
কলকাতার ব্যস্ততম পার্ক স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার ফুটপাতে গত পঞ্চাশ বছর ধরে বসবাস করছেন পাঞ্জাব থেকে আসা সীতা। গত শনিবার বিকেলে ফুটপাতে স্টোভ জ্বালিয়ে নিজের শিশুর জন্য দুধ গরম করছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময়েই রাজ্য সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ফুটপাত জবরদখলমুক্ত করার অভিযানে সেখানে উপস্থিত হন।
ফুটপাতে স্টোভ জ্বলতে দেখে মন্ত্রী মেজাজ হারিয়ে সীতাকে প্রশ্ন করেন, ফুটপাতে কেন বাচ্চার দুধ গরম করা হচ্ছে এবং তাদের সেখানে সংসার পাতার অধিকার কে দিয়েছে। এই তিরস্কারের পর থেকে ভয়ে ওই বৃদ্ধা আর ফুটপাতে দুধ জ্বাল দেওয়ার সাহস পাননি। মন্ত্রীর এই আচরণের ঘটনাটি ঘিরে কলকাতার রাজনীতিতে এখন তোলপাড় চলছে এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, সৌন্দর্যবর্ধনের এই পদক্ষেপ কি মানবিক?
এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ ওই বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা করে তাঁর পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন। কুণাল ঘোষ প্রশাসনের এই অভিযানের সমালোচনা করে বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার নামে অমানবিক হওয়া চলবে না এবং ছিন্নমূল মানুষদের জন্য একটি সঠিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
এদিকে সমালোচনার মুখেও সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। তিনি বলেন, বাচ্চার দুধ ফোটানো বা পকোড়া ভাজা— কোনো কারণেই পথচারীদের হাঁটার জায়গা দখল করা সহ্য করা হবে না। এছাড়া তিনি ফুটপাতে স্টোভ জ্বালানোকে পথচারী ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের জন্য অগ্নিকাণ্ডের মতো মারাত্মক বিপদের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিরোধীদের পাল্টা তোপ দেগে মন্ত্রী দাবি করেন, যারা এখন রাজনীতি করছেন, তাদের কেউ ওই শিশুটির জন্য দুধ নিয়ে এগিয়ে আসেননি।
কলকাতা শহরে উন্নয়ন বনাম মানবিকতার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। সীতার মতো প্রান্তিক মানুষগুলো নগরোন্নয়নের কঠোর নীতির যাঁতাকলে বারবার পিষ্ট হচ্ছেন। ফুটপাত পথচারীদের অধিকারের জায়গা, আবার বহু দশক ধরে এই নিম্নবিত্ত জনবসতির জীবনযুদ্ধও সমান বাস্তব। রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা ছাড়াই কেবল ধমক দিয়ে বা জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে শহরের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব কি না, তা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :